কেরির নীলকুঠিতে ঘুঁটে দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা

স্বপনকুমার চক্রবর্তী, বামনগোলা : নীলকুঠি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অত্যাচারী কিছু ইংরেজ আর ভারতীয় চাষিদের ওপর নীলকরদের অন্যায়-অবিচার। কিন্তু মদনাবতীর নীলকুঠির দায়িত্বে থাকা উইলিয়াম কেরির সময়ে ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ অন্য কথা। তিনি দেশ, বলা ভালো বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন মন থেকে। তাই শুধু ভাষা নয়, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও জোর দিয়েছিলেন তিনি। সমস্তরকম চেষ্টা চালিয়েছিলেন যাতে সমাজ থেকে দূর করা যায় কুসংস্কারগুলিকে। আর তাই সেসময়ে মানুষগুলোও বাঁচতে শিখেছিলেন ইংরেজ এই সাহেবকে আঁকড়ে ধরেই। মদনাবতীর ওই নীলকুঠি তাঁদের সামনে খুলে দিয়েছিল এক প্রশস্ত দিগন্ত। কিন্তু সময়ে সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছুই। বদলেছে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং প্রজন্মও। তাই উইলিয়াম কেরির স্মৃতি বিজড়িত ওই নীলকুঠি আজ ধ্বংসের মুখে পৌঁছে গেলেও হেলদোল নেই কারোরই।

সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছিল যে, নীলকুঠি সংলগ্ন এলাকা থেকে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ। স্বাভাবিকভাবেই ফিকে হয়ে আসছিল সবুজের অংশ। তার মধ্যেও কোনওরকমে উইলিয়াম কেরির স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল এই নীলকুঠি। কিন্তু গাছ কাটার সেই ক্ষত না শুকোতেই ফের কুঠির ভগ্নাবশেষে মানুষের স্বেচ্ছাচারিতার ছবি স্পষ্ট। ইতিহাসপ্রেমী সহ বহু মানুষের অভিযোগ, কেরি সাহেবের স্মৃতি বিজড়িত নীলকুঠিটিকে যখন বাঁচানোর পথ খোঁজা হচ্ছে, তখন নীলকুঠির ভগ্নাবশেষের গায়ে গোবরের ঘুঁটে দিচ্ছেন কিছু মানুষ। তা যে শুধু দৃষ্টিকটুই তা নয়। বরং এর ফলে ইতিহাসের গন্ধ মাখা নীলকুঠির ভগ্নাবশেষের পাঁজরের ইটগুলিও নষ্ট হওয়ার পথে। ইতিহাসপ্রেমীরা এর জন্য যেমন দায়ী করেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের, তেমনই অভিযোগ তুলেছেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

- Advertisement -

১৭৮৪ সালের ১৫ জুন উইলিয়াম কেরি মালদার প্রত্যন্ত এলাকা মদনাবতীতে নীলকুঠির ম্যানেজার হিসাবে যোগ দেন। সেসময় গরিব মানুষের স্বার্থে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি সহ উন্নত বীজ আনানোর ব্যবস্থাও করেন নিজের উদ্যোগেই। তা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে সকলের মনে। শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষায় গ্রন্থ ছাপানোর সুবিধার জন্য ১৭৯৮ সালে তিনি ৪০ পাউন্ড দিয়ে একটি কাঠের মুদ্রণ যন্ত্র কিনে বসান নীলকুঠিতে। এই নীলকুঠির ভগ্নাবশেষকে সংস্কার করে তা সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করার দাবি উঠেছে বারবার। দাবি উঠেছে, নীলকুঠির কাছে থাকা একটি বন্ধ সুড়ঙ্গের মুখ খনন করে ইতিহাসকে জাগিয়ে তোলারও। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় থাকা কেরি সাহেবের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও বই এনে সংগ্রহশালা করে একটি পর্যটন কেন্দ্র করার কথাও বলেন অনেকে।

কিন্তু ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার সেসব দাবি আজও পূরণ হয়নি। তারওপর বারবার এমনভাবে ইতিহাসের স্মৃতিতে আঘাত হানায় রীতিমতো উদ্বিগ্ন তাঁরা। বিক্ষুব্ধ ইতিহাসপ্রেমীরা বলেন, সুবিধাবাদী কিছু মানুষের অজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার ফলেই কেরি সাহেবের স্মৃতি বিজড়িত মদনাবতীর নীলকুঠির আজ এই দশা। তবে একমাত্র প্রশাসনের নজরই যে একমাত্র এই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে তা মনে করছেন তাঁদের সকলেই।