দক্ষিণ দিনাজপুরে সরকারের উদাসীনতায় গ্রন্থাগারগুলি ধুঁকছে

রাজু হালদার, গঙ্গারামপুর : দীর্ঘ সরকারি উদাসীনতা এবং কর্মী সংকটের ফলে দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রন্থাগারগুলি ক্রমশ বেহাল হয়ে পড়েছে। জেলার প্রায় সিংহভাগ গ্রন্থাগার কর্মী সংকটের জেরে বন্ধ হওয়ার মুখে। পাঠক পরিষেবাও তলায় গিয়ে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিতে গ্রন্থাগারগুলিতে অবিলম্বে কর্মী নিয়োগের দাবিতে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী সহ বিশিষ্টজনেরা সরব হলেন।

পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য, শিল্প এবং সংস্কৃতির সম্প্রচার ও সম্প্রসারণের জন্য বাম আমলে রাজ্যজুড়ে অসংখ্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এরপর আট এবং নয়ের দশকে গ্রন্থাগারগুলি চরম জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গবেষণা, পড়াশোনা এবং অবসর যাপনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল গ্রন্থাগার। নয়ের দশকের শেষে দূরদর্শন এবং পরবর্তীতে মোবাইল ফোনের বাড়বাড়ন্তের ফলে ক্রমশ গ্রন্থাগারের জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে।

- Advertisement -

এরপর গত ১০ বছরে পশ্চিমবঙ্গের গ্রন্থাগারগুলির হাল ধীরে ধীরে ভয়াবহ হতে শুরু করে। সরকারি উদাসীনতা এবং কর্মী সংকটের জেরে গ্রন্থাগারগুলি বেহাল হয়ে পড়েছে। গত দেড় দশকে গ্রন্থাগারগুলিতে সেভাবে কোনও কর্মী নিযোগই হয়নি। অন্যদিকে, পুরোনো কর্মীরা অবসর নেওয়ার ফলে কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ৫৭টি গ্রন্থাগার রয়েছে। তার মধ্যে ৫২টি গ্রামীণ গ্রন্থাগার, ৪টি শহর গ্রন্থাগার এবং একটি জেলা গ্রন্থাগার। বর্তমানে একজন গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগারকর্মীকে দুটি অথবা তিনটি করে গ্রন্থাগার পরিচালনা করতে হচ্ছে। কর্মী সংকটের জেরে অধিকাংশ গ্রন্থাগার সপ্তাহে দুদিন অথবা তিনদিন করে খোলা থাকছে। ফলে গ্রন্থাগার পরিষেবার মান ক্রমশ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে পাঠকেরাও ক্রমশ গ্রন্থাগার বিমুখ হয়ে পড়ছেন।

গ্রন্থাগারগুলির এই অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুত কর্মী নিয়োগের দাবি তুললেন গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী সহ বিশিষ্টজনেরা। এক গ্রন্থাগারিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গ্রন্থাগারগুলি কর্মী সংকটে ভুগছে। ফলে একজন গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগার কর্মীকে দুটো অথবা তিনটে করে গ্রন্থাগারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সপ্তাহে দুদিন অথবা তিনদিন করে প্রতিটি গ্রন্থাগার খোলা থাকছে। দ্রুত কর্মী সংকট না মেটালে গ্রন্থাগারের সমস্যার সমাধান হবে না।

গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের ছাত্র বিমান বসাক বলেন, ২০১০ সালে আংশিকভাবে গ্রন্থাগারগুলিতে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। তারপর থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কোনও গ্রন্থাগারে কর্মী নিয়োগ হয়নি। ফলে গ্রন্থাগারগুলি বেহাল দশায় রয়েছে। অন্যদিকে, নিয়োগ বন্ধ থাকার ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমার মতো বহু ছাত্রছাত্রী বেকার হয়ে বসে আছে। আগামীদিনে দ্রুত কর্মী নিয়োগ করা হলে একদিকে যেমন গ্রন্থাগারগুলির কর্মী সংকট মিটবে, অন্যদিকে আমাদের মতো বহু ছাত্রছাত্রীর কর্মসংস্থান হবে।

সাহিত্যিক তথা নাট্যকার ডঃ গোবিন্দ পাল বলেন, গ্রন্থাগার হল আমাদের সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক। তাই গ্রন্থাগারকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে উজ্জীবিত এবং সচল রাখতে হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। দ্রুত কর্মী সংকট মিটিয়ে সাধারণ মানুষকে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে আমাদের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।

অধ্যাপক তথা লোকসংস্কৃতি গবেষক গৌতম সরকার বলেন, গ্রন্থাগার বিমুখ পাঠককে ফেরাতে গ্রন্থাগার দপ্তরকে প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে ব্লক বা অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি চালু করা যেতে পারে। কিন্তু সবার আগে উপযুক্ত কর্মী নিয়োগ প্রয়োজন।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক দেবব্রতকুমার দাস বলেন, গ্রন্থাগার দপ্তরে আপাতত কর্মী নিয়োগের কোনও খবর আমার জানা নেই। এটি রাজ্য সরকারের বিষয়। আমি এ বিষয়ে বিশদে কিছুই বলতে পারব না। দেবব্রতবাবু বলেন, একজন গ্রন্থাগারকর্মীকে দুটি অথবা তিনটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। আর একজন গ্রন্থাগারকর্মী একটি গ্রন্থাগারে ধারাবাহিকভাবে কাজ করলে পাঠকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক হয়। কিন্তু আংশিকভাবে কাজ করলে সেই সম্পর্কের ছেদ হয়। পরিষেবা কম হয়।

সম্প্রতি রাজ্য সরকার বিভিন্ন সাধারণ গ্রন্থাগারগুলিতে বাংলা সহায়তা কেন্দ্র নামে একটি প্রকল্প সূচনা করার ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অন্যান্য দপ্তরের মতো গ্রন্থাগারেও পরিষেবা দেওয়া হবে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গ্রন্থাগারগুলিতে কবে বাংলা সহায়তা কেন্দ্র চালু হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরে দেবব্রতকুমার দাস বলেন, বেশ কিছু নির্বাচিত গ্রন্থাগারে বাংলা সহায়তা কেন্দ্র চালু হবে বলে আমরাও সংবাদমাধ্যমে জানতে পেরেছি। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য বা চিঠি গ্রন্থাগার দপ্তর কিংবা জেলা শাসকের কাছ থেকে পাইনি। তাই এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানাতে পারব না।