রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : দেয়ালের রং চটেছে কবেই। চুনসুরকি ফ্যাকাসে হয়ে বালি, সিমেন্টের ঝুরঝুরে পলেস্তারা দেয়াল জুড়ে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা ছাদের। সেখানে পলেস্তারাই শুধু খসে পড়েনি, ভেঙে পড়েছে ছাদের চাঙড়ও। আর সেই ছাদের নীচেই দিনভর শিক্ষার পাঠ নিচ্ছে শিশুরা। যে কোনও সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে স্কুলের ছাদ। সব দেখেশুনেও অসহায় স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকরা। অগত্যা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে রোজ স্কুল করতে হচ্ছে পুরাতন মালদার পূর্ব বাঞ্ঝাপাড়া প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়া ও শিক্ষকদের।

পুরাতন মালদার ভাবুক গ্রাম পঞ্চায়েতের ধলসোনা বুথে অবস্থিত পূর্ব বাঞ্ঝাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই বুথের অন্তর্গত চারটি গ্রামের ভরসা এই প্রাইমারি স্কুলটি। গ্রামগুলির বেশিরভাগ বাসিন্দা আদিবাসী সম্প্রদায়ে। এলাকার অর্থনীতি মূলত চাষবাস ও পশুপালন নির্ভর। উন্নয়নের নিরিখে অনেকটাই পিছিয়ে থাকা ওই গ্রামগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের জন্য ১৯৭৩ সালে পূর্ব বাঞ্ঝাপাড়া প্রাইমারি স্কুল গড়ে উঠেছিল। শুরু থেকেই নানা সমস্যায় জেরবার স্কুলটি। স্কুলে পানীয় জলের সংকট দীর্ঘদিনের। স্কুল সংলগ্ন টিউবওয়েছের জল দিয়ে রান্নাবান্না ও শৌচকর্ম চলত। পরবর্তীকালে জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগের জলের পাইপলাইন সংযোগ হয়েছিল স্কুলটিতে। তবে প্রায় দুবছর আগে সেই পাইপলাইন ফেটে যায়। কিন্তু তা আর মেরামত হয়নি। তাই এখন পানীয় জলের সংকটে ভুগছে স্কুলটি। আশেপাশের কিছু সহৃদয় ব্যক্তির সহায়তায় এখন মিড-ডে মিল রান্না হয়। তবে বিদ্যুৎ না থাকলে তাতেও ছেদ পড়ে। এমন সংকটাপন্ন স্কুলে বর্তমানে জ্বলন্ত সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে স্কুল ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা।

- Advertisement -

১৯৭৩ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হলেও ২০০৬ সাল নাগাদ পাকা ভবন তৈরি হয় স্কুলে। যদিও দেড় দশক সময় কাটতে না কাটতেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে গোটা স্কুল ভবনটি। তিনটি ক্লাসরুম, একটি টিচার্স রুম এবং একটি শৌচালয় রয়েছে স্কুলে। তবে এর মধ্যে একটি ক্লাসরুমের ছাদের সিংহভাগ ভেঙে পড়তে শুরু করায় সেটি তালাবন্ধ করে রাখা রয়েছে। বাকি দুটি ক্লাসরুমে কোনও মতে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস হয় বলে জানালেন শিক্ষকরা। ক্লাসরুমের বাইরে বারান্দার ছাদও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই ছাদের চাঙড় খসে বেরিয়ে পড়েছে লোহার কাঠামো। ওই অবস্থাতেই পঠনপাঠন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা।

স্কুলের এমন বেহাল দশায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। বিশু কোরামুদি নামে এক অভিভাবক বলেন, এই এলাকায় এই একটি মাত্র প্রাইমারি স্কুল। অথচ স্কুলের হাল খুব খারাপ। পানীয় জলের কোনও ব্যবস্থা নেই। আশেপাশের বাড়ি থেকে জল এনে মিড-ডে মিল রান্না হয়। ইতিমধ্যেই দিদিকে বলোয় ফোন করে বিষয়টি আমরা জানিয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে। তবে কোনও কাজই হয়নি। এখন স্কুলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ভবনের বেহাল অবস্থা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আমাদের আতঙ্কিত থাকতে হয়। যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে ওই স্কুলের ছাদ।

প্রাথমিক স্কুলের এমন জরাজীর্ণ দশার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন শিক্ষকরা। তবে বারবার অনুরোধ করেও আখেরে সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অসহায় বোধ করছেন তাঁরাও। প্রধান শিক্ষক সুমনকুমার সাহা বলেন, আমি ২০১০ সালে স্কুলে যোগ দিই। তারপর থেকে দেখছি ক্রমশই স্কুল ভবনের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এমনকি এখানে পানীয় জলেরও সমস্যা রয়েছে। প্রশাসনকে বারবার করে জানিয়ে কোনও সুরাহা হয়নি। একটি ঘরের ছাদের অবস্থা খারাপ হওয়ায়, সেটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। বাকি দুটো ঘরে কোনও রকমে ক্লাস করছি। যে কোনও দিন দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। যদিও স্কুলের এমন দুরবস্থা কবে ঘুচবে সে সম্পর্কে কোনও ইঙ্গিত দিতে পারেননি কেউই। বিষয়টি নিয়ে আদিনা সার্কেলের স্কুল পরিদর্শককে ফোন করা হলেও তাঁর প্রতিক্রিয়া মেলেনি।