জলকাদায় ভরেছে গ্রামের রাস্তা, ঢোকে না অ্যাম্বুল্যান্স

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : গ্রাম থাকলে যোগাযোগের রাস্তা থাকাটা উচিত ও সেটা অধিকারও বটে। যদিও পুরাতন মালদার ভাবুক গ্রাম পঞ্চায়েতের মহাজীবনগর এলাকার বহু আদিবাসী নাগরিক দশকের পর দশক ধরে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোট এলে গ্রামে পাকা রাস্তার স্বপ্ন দেখায় সব রাজনৈতিক দল। ভোট পার হলেই তারা ভুলে যায় সব প্রতিশ্রুতি। অনুনয়-বিনয়, আবেদন-নিবেদন কতবার হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যদিও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। তাই ওই এলাকায় গেলে রাস্তা বলে যেটা নজরে পড়বে, সেটা জলকাদায় ভরা নালার মতো।

রাস্তার অবস্থা এতটাই বেহাল যে গ্রামে ঢোকে না অ্যাম্বুল্যান্সও। গর্ভবতী ও গুরুতর অসুস্থদের খাটিয়ায় করে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। খুব বাধ্য না হলে রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন না কেউই। অভিযোগ, রাস্তা সংস্কারের দাবিতে আমল দেয়নি পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসন। অগত্যা কোনও আধিকারিক, সাংবাদিক দেখলেই করজোড়ে গ্রামের মানুষের একটাই আবেদন দয়া করে রাস্তার একটা ব্যবস্থা করুন। পুরাতন মালদার ভাবুক গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা মহাজীবনগর। গাজোল ও পুরাতন মালদা ব্লকের সীমান্ত লাগোয়া এই এলাকা। গ্রামে ঢুকতে হলে পুরাতন মালদার ছিটকামহল অথবা গাজোলের গোলঘর দিয়ে একচিলতে পথ দিয়ে ঢুকতে হয়। তবে ওই রাস্তাগুলির অবস্থা খুবই শোচনীয়। ছিটকামহল থেকে যে রাস্তাটি মহাজীবনগর হয়ে লালমাটি পর্যন্ত চলে গিয়েছে, সেটির দৈর্ঘ্য প্রায় চার কিলোমিটার। এই রাস্তাটির দৈন্যদশা লিখে প্রকাশ করার মতো নয়। বালিয়াপাড়া, জহুরি মুন্ডাপাড়া, সগলেপাড়া, হাতিডুবি, মহাজীবনগরের মতো গ্রামকে জুড়েছে ওই রাস্তা। গ্রামগুলির আশি শতাংশেরও বেশি মানুষ পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের।

- Advertisement -

এলাকায় দুহাজারেরও বেশি ভোটার রয়েছেন। যদিও শুরু থেকেই বঞ্চনার আঁধারে রয়ে গিয়েছেন তাঁরা। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি মিললেও ভোট পার হলেও সইতে হয় শুধুই বঞ্চনা। গ্রামের রাস্তাও সেই বঞ্চনার সাক্ষ্য বহন করে বছরভর। শুখা মরশুমে ধুলো ও খানাখন্দে ভরা মেঠো পথে কোনওরকমে চলাচল সম্ভব হলেও বর্ষাকালে চরমে ওঠে পরিস্থিতি। মাটির কাঁচা রাস্তায় জলকাদা জমে থাকে মাসের পর মাস। চাষের জন্য ট্র‌্যাক্টর ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করায় রাস্তাজুড়ে জলকাদার নালা তৈরি হয়ে যায়। স্বভাবতই ওই রাস্তা মানুষ চলাচলের যোগ্য থাকে না। যদিও মহাজীবনগরের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের মানুষ ওই রাস্তাই ব্যবহার করতে বাধ্য থাকেন। হাটবাজার ছাড়াও জরুরি কাজে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয় গ্রামবাসীদের। রাস্তায় আছাড় খেয়ে হাড়গোড় ভেঙেছে অনেকের। রাস্তায় অহরহ আছাড় খান বাইক ও সাইকেল আরোহীরা। গ্রামের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।

গুরুত্বের বিচারে এই রাস্তা অত্যন্ত জরুরি হলেও অভিযোগ, রাজনৈতিক কোন্দলের জেরে আজ পর্যন্ত রাস্তা তৈরিই হয়নি এখানে। যার ফল ভুগতে হচ্ছে ওই এলাকার হাজার হাজার আদিবাসী বাসিন্দাদের। সোনা মুর্মু নামে এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ভোটের সময় সবাই বলে রাস্তা করে দেব। কিন্তু ভোট ফুরোলে আর কারও দেখা মেলে না। এমন খারাপ রাস্তা আর অন্য কোথাও নেই। আমাদের গ্রামে অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে চায় না। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা নিরুপায়। আমাদের অনুরোধ, এই রাস্তাটি সংস্কার করে পাকা করে দিন। রমেশ মুন্ডা নামে আরেক বাসিন্দা জানালেন, গ্রামের রাস্তা এতটাই খারাপ যে অ্যাম্বুল্যান্সও ঢুকতে পারে না। গ্রামের বাইরেই দূরে অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে থাকে। খাটিয়ায় করে রোগীকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের কি এভাবেই কষ্ট সহ্য করে থাকতে হবে। কেন রাস্তা সংস্কার করা হবে না?

মহাজীবনগর এলাকার পঞ্চায়েত সদস্যা প্রমীলা মুর্মু জানালেন, এই এলাকার রাস্তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। পঞ্চায়েতে রাস্তা সংস্কারের কথা বারবার জানিয়েছি। কিন্তু আমি বিরোধী দলের সদস্য হওয়ায় বিজেপি পরিচালিত পঞ্চায়েত আমার দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি আমাকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে এবিষয়ে ভাবুকের পঞ্চায়েত প্রধান লক্ষ্মীরাম হাঁসদা জানিয়েছেন, ছিটকামহল থেকে লালমাটি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। ওই রাস্তাটি সংস্কারের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললেই রাস্তাটি সংস্কারের কাজে হাত দেওয়া হবে। তবে প্রধানের আশ্বাসেও আশ্বস্ত হতে পারছেন না গ্রামবাসীরা। কারণ এর আগে আশ্বাস মিললেও তা বাস্তবায়িত হয়নি আজ পর্যন্ত।