জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : মাটি খননের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১০০ দিনের কর্মসুনিশ্চিত প্রকল্পের কাজের গড় উত্তরবঙ্গে হ্রাস পেয়েছে। অভিযোগ, মাটি খননের কাজের ক্ষেত্রে শ্রমদিবস বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্য করেছে বিশেষজ্ঞ মহল। তাই মাটি খননের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় এই প্রকল্পের মজুরির বিপুল অঙ্কের টাকা বকেয়া রয়েছে। উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার কেন্দ্রের কাছে বকেয়ার পরিমাণ ১৬০ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত গড়ে প্রায় ৩৩ দিন কাজ দেওয়া গিয়েছে। মজুরি বকেয়া থাকায় দিনমজুরদের ১০০ দিনের কাজ করার ক্ষেত্রে অনীহা জন্মেছে। তবে বিকল্প কোনো পথ না থাকায় গ্রামাঞ্চলে দিনমজুররা ১০০ দিনের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রাদেশিক কৃষক নেতারা ১০০ দিনের কাজ নিয়ে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনায় সরব হয়েছেন।

১০০ দিনের কর্মসুনিশ্চিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে কাজের নিরিখে উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার মধ্যে ছটি জেলাই পিছিয়ে পড়েছে। চলতি বছরে রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে গড় কাজের পরিসংখ্যানের নিরিখে ২২তম স্থান অধিকার করেছে কোচবিহার। ২১তম জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে আলিপুরদুয়ার। জলপাইগুড়ি জেলাও পিছিয়ে পড়েছে। এই জেলা রয়েছে ১৯ নম্বরে। ব্যতিক্রম শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ এবং কালিম্পং জেলা। কালিম্পং ততীয় স্থানে এবং শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ চতুর্থ স্থানে রয়েছে।

- Advertisement -

কোচবিহার জেলায় কর্মপ্রার্থীরা কাজ পেয়েছেন গড়ে ২৪.৭০ দিন। কাজ করেছেন ১ লক্ষ ৮০ হাজার ১৫৩ জন। এই জেলায় শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে ৪৪ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৬২। তপশিলি জাতি ও আদিবাসী অধ্যুষিত আলিপুরদুয়ার জেলায় কাজ হয়েছে গড়ে ২৬.৭২ দিন। কাজ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৯ হাজার ২৮৭ জন। শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে ২৯ লক্ষ ২০ হাজার ৩০৯। জলপাইগুড়ি জেলায় কাজ হয়েছে গড়ে ২৭.৪৩ দিন। কাজ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৩ হাজার ৪৪৭ জন। শ্রমদিবস তৈরির সংখ্যা ২৮ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০৩। দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলে চলতি বছরে গড়ে ২৯ দিন কাজ পেয়েছেন কর্মপ্রার্থীরা। এখানে এই প্রকল্পে কাজে নিযুক্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৬৯৭ জন। শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে ৩ লক্ষ ১০ হাজার ১৭৮।

মালদা জেলা ১৩তম স্থান অধিকার করেছে। এই জেলায় কাজ হয়েছে ৩৩.২১ শতাংশ। কাজ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৬৮১ জন। শ্রমদিবস হয়েছে ৪৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ৫৩০। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা ১২তম স্থান অধিকার করেছে। এই জেলায় কাজ পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯১৫ জন। শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে ১২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৯৪৭। নবম স্থান অধিকার করেছে উত্তর দিনাজপুর জেলা। এই জেলায় কাজ পেয়েছেন ৮০ হাজার ৩৩৮ জন। শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে ২৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৬১। কাজ হয়েছে গড়ে ৩৪.৮৩ দিন। তৃতীয় স্থান পেয়েছে কালিম্পং জেলা। এই জেলায় গড়ে ৪০.৭৯ দিন কাজ হয়েছে। কাজ পেয়েছেন ২০৬৪ জন। শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে ৮৪ হাজার ১৯৮। চতুর্থ স্থানে আছে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ। ৩৯.২৩ শতাংশ কাজ হয়েছে এখানে। কাজ পেয়েছেন ১৫ হাজার ৬ জন। শ্রমদিবসের সংখ্যা ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার ৬৩১।

উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে ১০০ দিনের কর্মসুনিশ্চিত প্রকল্পের মজুরির টাকা কেন্দ্রীয় সরকার বকেয়া ফেলেছে। ফলে উত্তরের জেলা প্রশাসন বিপাকে পড়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে ৬ কোটি ৫৬ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকা, উত্তর দিনাজপুরে ১৮ কোটি ২৭ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকা, জলপাইগুড়িতে ২৭ কোটি ৬৭ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা, মালদায় ৬ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা, কোচবিহারে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা, শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদে ৪ কোটি ৮২ লক্ষ ১১ হাজার টাকা, দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলে ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা এবং কালিম্পংয়ে ২৬ লক্ষ ৯ হাজার টাকা মজুরি খাতে বকেয়া রয়েছে।

জলপাইগুড়ি জেলায় সাতটি ব্লকে বাৎসরিক কাজের গড় যথেষ্টই নীচে নেমেছে। ধূপগুড়িতে ২৯.৫, জলপাইগুড়িতে ২৭.৫৮, মালে ২৭.১, মেটেলিতে ২৫.৪৯, ময়নাগুড়িতে ২১.৬৬, নাগরাকাটায় ২৫.৮৯ এবং রাজগঞ্জে ৩০.৪৯ দিন কাজ হয়েছে। এ বিষয়ে প্রাদেশিক কৃষকসভার রাজ্য কমিটির সদস্য অধ্যাপক জিতেন দাস বলেন, ১০০ দিনের কর্মসুনিশ্চিত প্রকল্প প্রশাসনিক তৎপরতার অভাবে সার্থক হতে পারছে না। কেন্দ্রীয় সরকার মজুরি খাতের বকেয়া অর্থ দিচ্ছে না। তৃণমূল কিষান খেত মজদুর কংগ্রেসের প্রদেশ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দুলাল দেবনাথ বলেন, রাজ্য সরকার ১০০ দিনের কর্মসুনিশ্চিত প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে সম্পদ সৃষ্টির জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।