কাস্ত্রোর মতে হিমালয়, সেরা বাঙালি মুজিব

433

নবেন্দু গুহ: সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু বঙ্গসন্তানের অবদান উল্লেখযোগ্য। বাঙালি বড় বেশি রকম রাজনীতি প্রিয় হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সেই অর্থে উল্লেখযোগ্যভাবে খুব বেশি রাজনৈতিক নেতার নাম মেলা মুশকিল। রাজনীতির আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রথম যে নামটি পাই, তিনি এমএন রায়, যাঁর আসল নাম নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। রুশ কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। এটি সেই সময়ে কম বড় দায়িত্ব ছিল না। মেক্সিকো কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। রাশিযার পর বিশ্বে দ্বিতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ছিল এটি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন এমএন রায়।

১৯২০ সালে তাসখন্দে সিপিআই প্রতিষ্ঠা করেন এমএন রায়, অবনী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাঙালিরা। পরবর্তী যে বঙ্গসন্তানের নাম পাদপ্রদীপে উঠে আসে, তিনি সুভাষচন্দ্র বসু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে নেতাজি এমন এক পর্যায়ে নিযে যান যে, সেই লড়াই বিশ্বের তাবড় দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বিদেশের মাটিতে তিনি গঠন করেছিলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ) বা আজাদ হিন্দ ফৌজ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নেতাজির এই স্বাধীনতা যুদ্ধ সফল হয়নি। যদিও এটা ঘটনা যে, নেতাজির নেতত্বে এই লড়াই ভারতবর্ষের মাটি থেকে ব্রিটিশ শাসকদের বিতাড়নকে ত্বরান্বিত করেছিল। আরও দুই বঙ্গসন্তানের নাম উল্লেখ করলে অনেকেই হয়তো ভুরু কোঁচকাবেন। তাঁরা দু’জন চারু মজুমদার এবং কানু সান্যাল। তাঁদের নেতত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন কিন্তু দারুণ সাড়া ফেলেছিল। শুধু আমাদের দেশে নয়, বিদেশেও নকশালবাড়ি আন্দোলন নিযে চর্চা কিছু কম হয়নি। তবে পন্থা-পদ্ধতি-কৌশল ইত্যাদি কারণে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল।

- Advertisement -

সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বলা যায়, সবথেকে সফল বাঙালি রাজনৈতিক নেতা হলেন শেখ মুজিবর রহমান। তাঁর নেতত্বে পাকিস্তানি অপশাসনের শৃঙ্খল থেকে বেরিযে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শেখ মুজিবরের নেতত্বে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। যদিও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মুজিবর রহমানের নেতত্বে এই মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের পেছনে ভারতের পূর্ণ সামরিক সহায়তা বড় রকমের সহায় ছিল। পাশাপাশি এটাও ঘটনা যে, ভারতের সামরিক সহায়তা যেমন স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম কারণ, তেমনই মুজিবরের স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাকে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত বাঙালি পূর্ণ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার লক্ষ্যে এই লড়াই বাঙালিরা লড়েছিলেন। নেতত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গসন্তান মুজিবর রহমান।

শতবর্ষ আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুজিবর রহমান। ব্রিটিশ শাসনকালে অখণ্ড ভারতের পূর্ববঙ্গে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ে মুজিববর্ষ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ মুজিবরের শতবর্ষ পূর্তি, আর ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির অর্ধশতবর্ষ। অবশ্য বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মুজিববর্ষ ছোট পরিসরে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার।

ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতিও জড়িয়ে পড়েন মুজিবর রহমান। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স পাস করার পর কলকাতায় মৌলানা আজাদ কলেজে (তত্কালীন ইসলামিয়া কলেজ) ভর্তি হন আইন পড়বেন বলে। এখানে তিনি যোগ দেন বেঙ্গল-মুসলিম লিগে। দেশভাগের পর মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লিগ। উর্দুভাষী পাকিস্তানি শাসকদের অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল হন। বাংলাভাষার স্বীকৃতির দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। অন্যান্যদের সঙ্গে ওই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হন মুজিব। পরবর্তীতে মুজিব সোহরাওযার্দি এবং মওলানা ভাসানি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওযামি মুসলিম লিগে যোগ দেন। পরে ওই দলেরই নাম হয় আওয়ামি লিগ। পাক শাসকদের অধীনে থেকে যে বাঙালির সর্বনাশ ছাড়া কিছু হবে না, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন মুজিবর রহমান। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। পাক সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে নেতত্ব দিতে দেখা যায় তাঁকে।

বাংলাভাষা এবং বাঙালির স্বার্থে মুজিবর রহমানের নেতত্বে আন্দোলন চরমাকার নেয়। ১৯৬৯ সালে এই আন্দোলন কার্যত গণঅভু্যত্থানের রূপ গ্রহণ করেছিল। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এক জনসভায় মুজিব ঘোষণা করেন, একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটি মুছে ফেলার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাংলা শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওযা যাবে না। আমি আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশ ডাকা হবে। ততদিনে মুজিবের নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধু সম্বোধনটি। মুজিবর হযে উঠলেন অবিসংবাদী নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনে আওয়ামি লিগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসককুল এটা কোনওভাবেই মেনে নিতে রাজি ছিল না। পাক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয় যাতে মুজিব কিছুতেই ক্ষমতায় না আসীন হতে পারেন। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিরা তখন ফুঁসছেন। ১৯৭০ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের মাঠে মুজিব তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

এরপর সামরিক আইন জারি করেন পাক শাসক ইয়াহিয়া খান। নেতাদের ধরপাকড় শুরু হযে যায়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুজিব ঘোষণা করেন, এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের যার আছে, তাই দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষপর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। এরপর গ্রেপ্তার হন মুজিব। কিন্তু তাঁর নেতত্বে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হযে যায় মুক্তিযুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী সেই মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে নিয়ে আসে নতুন প্রভাত।

বঙ্গবন্ধুর খ্যাতি কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল, কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল কাস্ত্রোর এক বক্তব্যে তা স্পষ্ট। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ দেশগুলির সম্মেলন চলাকালীন কাস্ত্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। পরে কাস্ত্রো সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে বলুন কিংবা সাহসিকতার দিক দিয়ে আমার কাছে এই মানুষটিই হিমালয়। এহেন হিমালয় সদৃশ মুজিবর রহমান গড়েছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে তাঁর সাধের বাংলাদেশ পরিণত হয় ইসলামিক রাষ্ট্রে। ভারতে জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধি আরএসএসপন্থী আততায়ীর হাতে নিহত হন ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুযারি। আর বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান নিজ বাসভবনে আততায়ীদের হাতে নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট। মুজিবর রহমানের বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন সফল হলেও, অনেক স্বপ্ন বিফলে গিয়েছে। তবু এটা ঘটনা যে, বিশ্ব রাজনীতিতে সেরা বাঙালি শেখ মুজিবই।