তৃণমূল কংগ্রেসের সাফাই অভিযান কি ভোটের দিকে তাকিয়ে

386

ডঃ নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সাপ ও দুর্নীতিপরায়ণ/দুষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সাপ শ্রেষ্ঠ (কৌটিল্য/ চাণক্য)

- Advertisement -

তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যসংখ্যা কত? কয়েক লক্ষ? কয়েক হাজার? অনেকে অনেক রকম বা ধরনের দাবি করতে পারেন। সঠিক কে বলা কঠিন। সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে দাবি দলের কর্মী-সদস্যরা মেনে নেবেন। বিরোধীরা উড়িয়ে দেবেন। আপাত নিরপেক্ষ জনগণ মুচকি হেসে এড়িয়ে যাবেন। আগমার্কা সমর্থকরা নেতাদের দাবি তুলে ধরে জোরকদমে লড়ে যাবেন। যেমন বলা হয় সদস্যসংখ্যার দিক থেকে বিজেপি পৃথিবীর বৃহত্তম দল। তুলনা করা হয় চিনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। উইকিপিডিয়াও তাই বলে। তবে চিন ওসবে পাত্তা দেয় না। কেন? তাদের কথা গোটা চিন দেশটাই আমাদের সদস্য। অর্থাত্ ১৪০ কোটি, যা কি না বিজেপির আনুমানিক সদস্য সংখ্যার ২৫ গুণেরও বেশি। তাই চিনের কাছে ওই হিসাব মূল্যহীন। এবার বলি এসব কেন বলছি বা অবতারণা করছি। অহেতুক নয়।

সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসে দুর্নীতিপরায়ণ লোক তাড়ানোর হিড়িক উঠেছে। শোনা যাচ্ছে, আমপানের ত্রাণ বিলি নিয়ে পিকে-অভি (প্রশান্ত কিশোর-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) কম্বিনেশন তৎপর হয়ে উঠেছেন। ২০২১ সালের আগে ঘর পরিষ্কার বা দল পরিষ্কার করতে হবে। ভাগ্যিস সাইক্লোন এল। তা না হলে কী যে হত! যা হোক সে সব বিচার আমার জন্য নয়। যাঁরা দল করেন বা তার সঙ্গে যুক্ত তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। আমি কেবল কিছু পাওয়া তথ্যের বিশ্লেষণ করতে পারি। তার বেশি কিছু বলতে বা করতে যাওয়া আমার কাজ নয়। অনেকটা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ব্যাখ্যার মতো। অনেকেই জানেন কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের আক্ষরিক অর্থ উদ্ধার করা যায়নি। পণ্ডিতরা তাই বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে চালিয়েছেন। ভাষা অন্তরায় এবং বহু আর্ষপ্রয়োগের ধাক্কায় আজ পর্যন্ত তার কোনও সঠিক মূলানুবাদ হয়নি। বলা চলে করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি মুক্তিকরণ অভিযান সেই রকম একটি বিষয়। কেন হয়? কীভাবে হয়? কারা করে? কেন করে? তবে জানা যায়, ছত্রপতি শিবাজি নাকি মোগলদের সঙ্গে লড়াইয়ে কৌটিল্যনীতি ব্যবহার করেছিলেন এবং সফলতাও লাভ করেন। কৌটিল্যের দণ্ডনীতি-সাম-দান-দণ্ড-ভেদ/মায়া-উপেক্ষা-ইন্দ্রজালকে আজকের পরিস্থিতিতে অনায়াসেই ব্যবহার করা যায়। প্রতিটি অক্ষর এখন প্রাসঙ্গিক। অবশ্য তা বুঝতে বা ব্যবহার করতে রাজা বা রাজর্ষি লাগে। আর সে রাজর্ষি এখন কোথায়?

ইতালীয় রাষ্ট্রচিন্তানায়ক ম্যাকিয়াভেলির ভাবনার অনেকটাই আমাদের জানা। প্রিন্স ও ডিসকোরসেস এই দুই বিখ্যাত গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করা যায় বা করা হয় এবং নেতা বা রাজারা তা কীভাবে করেন। কখন তা করা উচিত। কৌটিল্য বা ম্যাকিয়াভেলির মতো জগৎ বিখ্যাত বিশ্ব চিন্তানায়কদের উলটো দিক থেকে পড়তে হয়। সোজা করে পড়তে গেলে সাধারণ অজ্ঞ মানুষ তাঁদের ভুল বা উলটো বোঝেন। না জেনে বা না বুঝে কৌটিল্যনীতিকে কুটিলনীতি বলে এলোমেলো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিকে আবোল-তাবোল বুঝে কানিং ফক্স বা ধূর্ত শেয়াল-এর নীতি বলে তুলে ধরা হয়। চাণক্য বা কৌটিল্য বিষ-এর ব্যাখ্যা করেছিলেন যা কিছু প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর প্রিন্স গ্রন্থে বলেছিলেন, ক্ষমতা বা রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতার কোনও সংযোগ নেই। অর্থাৎ দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ রাজনীতি করেন। তাঁদের থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ তাঁরা হামেশাই বিষ পান করে থাকেন।

পরিসংখ্যান বলছে, আমপানের ত্রাণ বিলি নিয়ে এখনও পর্যন্ত দলের ৪ জন পঞ্চায়েত প্রধানকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব। তৃণমূল সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যাম মুখোপ্যাধায় ছাড়াও হুগলি, পশ্চিম বর্ধমান ও হাওড়ার বেশ কয়েকজন দলীয় নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর টুইট করে জানিয়েছেন, ডায়মন্ড হারবার ব্লকের মথুরাপুরের ১০৩টি পরিবার ত্রাণের ২০ লক্ষ টাকা ফেরত দিয়েছেন। দলের ঝাড়গ্রাম ইউনিটেও দুর্নীতি ধরা পড়েছে। ১০ বছর ক্ষমতায় তৃণমূল। কতজনকে দল থেকে তাড়ানো বা শোকজ করা হয়েছে দলের খুব কম নেতাই তা বলতে পারবেন।

২০ মে আমপান রাজ্যকে লন্ডভন্ড করে দেওয়ার পর থেকেই ত্রাণ বিলি নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের টনক নড়ে। দলের অভ্যন্তরে কিছু অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। সিপিএম জমানাতেও এই এক কারবার হত। সে ১৯৭৮ সালের বন্যা বা প্রতি বছর বর্ষার পরের বন্যায় ত্রাণ বিলি নিয়ে দলবাজি আর দুর্নীতির অভিযোগ উঠত। বড় নেতা ধরা পড়লে রাজ্য আর জাতীয় স্তরে কমিশন বসত। সে কমিশনের রিপোর্ট সচরাচর জানা যেত না। হঠাৎ ঘোষণা করা হত সেই নেতার সঙ্গে দলের সম্পর্ক কাট বা ঘুচে গিয়েছে। ছোট নেতা ধরা পড়লে জেলা কমিটির তরফে তাঁকে প্রথমে হুঁশিয়ারি, তারপর প্রকাশ্য সমালোচনা ও শেষে দলীয় মুখপত্রে ছোট ঘোষণা করে বহিষ্কার করা হত। আর দলীয় সম্মেলনের আগে শুদ্ধিকরণ বলে একটি বিষয় বাজারে ছাড়া হত। তাতে অভ্যন্তরীণ দলবাজির নিদর্শন হিসাবে অনেক কমরেড-কে কেটে বা ছেঁটে দেওয়া হত। পরে তাঁরাই আবার ব্যাকডোর দিয়ে ফিরে আসতেন। মন্ত্রীও হতেন।

যাই হোক কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপিতে ওসব কড়া সাংগঠনিক নিয়মকানুন নেই। এইসব দলে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। এককথায় ঘ্যাচাং ফু। যদিও সেখানে বুথ, ব্লক, জেলা এই সব নানা রকমের কমিটি আছে। বিজেপির ভিত্তি আরএসএস, তথাপি ক্ষমতার অলিন্দে থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মতো নিয়মকানুন মেনে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। চটজলদি কাজ এইসব দলের কর্মসূচি। আর তৃণমূল করছেও তাই। বিজেপিও রে-রে করে লোক তাড়াচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ জুড়ে সে কর্মসূচি চলছে। বলা হয় নরসীমা রাও যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে চিটিং বা শঠতা, ব্রাইবারি বা ঘুষ নেওয়া আর ফর্জারি বা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। মারা যাওয়ার পর তাঁর মরদেহ জাতীয় কংগ্রেস কার্যালয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কয়েদিন আগে বর্তমান কংগ্রেস অধ্যক্ষ রাহুল গান্ধি তাঁকে নতমস্তকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এটাই রাজনীতি। ম্যাকিয়াভেলি যে আজও দিনের মতো সত্য তা প্রমাণিত। এ রাজ্যে এখন দেখার পিকে-অভির কর্মসূচিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল হয়। ২০২১ সালে শেষরক্ষা হয় কি না। না কি তা মরণকালে হরিনাম-এর চেহারা নেয়। এখন কেবল সময়ে অপেক্ষা।