বাংলার ইতিহাসের অস্ত্রোপচার করে কৃত্রিম শেকড় পুঁতে দেওয়া অসম্ভব

381

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য

 পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনটাকে প্রায় একটা ছোটখাটো আইপিএল বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আট দফার নির্বাচন, প্রায় আইপিএল মার্কা আড়ম্বর, আইপিএলের মতোই দলবদলের হিড়িক। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে এবার খুব সঠিকভাবেই আইপিএল অবশেষে মাঝপথে বাতিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটা শেষ হয়েছে একটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট গণরায়ের মধ্য দিয়ে।

- Advertisement -

দুবছর আগে লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে বিজেপি পেয়েছিল ১৮টি আসন আর ৪০ শতাংশ ভোট। বিধানসভার হিসেবে তারা ১২১টি আসনে এগিয়ে ছিল। প্রচার চলছিল ওই সেমিফাইনালের পর এবার ফাইনালটাও বিজেপি পকেটে পুরে নেবে। ২ মে-র পর আসল পরিবর্তন, আর তখন দিলীপ ঘোষরা কীভাবে বহু মানুষকে রগড়ে দেবেন, সেই চর্চাও বেশ জোর গলায় শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জনগণ বাদ সাধলেন।

আট দফা নির্বাচন, নরেন্দ্র মোদির ২৩টি জনসভা, অমিত শার ৭৯টি রোড শো ও অন্যান্য কর্মসূচি, শীতলকুচিতে ঠান্ডা মাথায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যু, বাংলাদেশে গিয়ে মোদির মন্দির পরিক্রমা, এসব কিছুর পরেও বিজেপির ভোট কমল দুই শতাংশ। আর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় আসন কমে গেল ৪৪টি। অবশ্যই পাঁচ বছর আগের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় বিরাট এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি।

লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট বৃদ্ধি পেয়েছে চার শতাংশ। সব মিলিয়ে বিজেপির থেকে দশ শতাংশ বেশি আর এই কারণেই দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরেও, বড় অংশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস তৃতীয় দফার জন্য আবার ক্ষমতায়। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে তৃণমূলকে কে সরাবে প্রশ্নকে ছাপিয়ে গিয়েছে বিজেপিকে কে রুখবে প্রশ্নটি। সিপিএম নেতৃত্বকেও নির্বাচনের পরে এই কথা স্বীকার করে নিতে হচ্ছে।

আজ ২০২১ সালে সাত বছরের মোদি সরকার ও রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ভুক্তভোগী মানুষের অবস্থান থেকে দেখলে এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। বিজেপিকেও একবার দেখা যাক, অথবা আগে রাম, পরে বাম এমন কোনও ফাঁদে পা না দিয়ে ঠেকে শেখার জন্য অপেক্ষা না করে, বাংলার মানুষ দেখেই শিখে ফেলার বিচক্ষণতাকে বেছে নিয়েছেন। স্পষ্টতই এই ভোট যতটা না তৃণমূলের পক্ষে, তার চেয়ে অনেক বেশি এবং সবার আগে, বিজেপির বিরুদ্ধে। আর বিজেপি মানে শুধু দিলীপবাবু বা তৃণমূল থেকে আসা মুকুল-শুভেন্দু নন, বিজেপি মানে মোদি সরকার, বিজেপি মানে আরএসএস।

প্রতিবেশী রাজ্য অসম, যেখানে বিজেপি কিছু আসন হারিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারল সেখানে বাংলায় কেন বিজেপিকে ধাক্কা খেতে হল? দুই রাজ্যেই উন্নয়নের কথা বললেও বিজেপির আসল তুরুপের তাস ছিল, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর জুজুর ভয় দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করা। অসমের বহু বিভক্ত ও জটিল সামাজিক বিন্যাসে এই তাস এই মুহূর্তে বেশ কাজে লেগে গেলেও, বাংলায় তা তেমন কাজ দিল না। এটা আপাত স্বস্তির খবর এবং এই আপাত স্বস্তিকে দৃঢ়নিশ্চয়তায় পরিণত করাটা এখন বাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

কীভাবে বাংলা রুখে দিল সাম্প্রদাযিক বিভাজন ও বিদ্বেষের রাজনীতিকে? প্রশান্ত কিশোরের রণনীতি, সরকারের বিভিন্ন অনুদান প্রকল্পের প্রভাব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব এসব নিয়ে প্রচুর চর্চা চলছে। অন্য কয়েকটি সূত্রের কথা বলা যাক। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে ঠেকাতে চাই মেহনতি মানুষের ঐক্য। কৃষক ও শ্রমিকের শ্রেণি চেতনা, শ্রেণি ঐক্য, শ্রেণি সংগ্রামের ধারা আজ অতীতের তুলনায় দুর্বল। তবুও লকডাউনের মার আর পেট্রোল-ডিজেল-গ্যাস, রান্নার তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল গরিব মানুষ ডাবল ইঞ্জিনের প্রতিশ্রুতিতে উৎসাহিত নয়, বরং বিরক্ত হয়েছেন।

যোগী রাজ্যের লাভ জেহাদ নিরোধক আইন আর অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াড, দিলীপবাবুর বারমুডা পরার পরামর্শ আর টেলিভিশনের স্টুডিওতে বসে ন্যাকামি করবেন না ধমক আর খোদ মোদির মুখে লাগাতার ও দিদি মন্ত্রোচ্চারণ নিশ্চয়ই হিন্দু-মুসলিম, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে বাংলার নারীসমাজের কানে মধুবর্ষণ করেনি। আর করোনাকালে অক্সিজেনের অভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশবাসী প্রাণ হারাচ্ছেন, শহরের রাস্তায়, রাজধানীর পার্কে, গোটা দেশজুড়ে সারি দিয়ে চিতা জ্বলছে আর লোকে লাইন দিয়ে বুথে বুথে ইভিএমে ডাবল ইঞ্জিনের জয়ধ্বনি দিয়ে আসবেন, এটা এই প্রচার-সর্বস্ব জুমলাময় সময়ে সম্ভব ছিল না।

নরেন্দ্র মোদি প্রচুর বাংলা বলার চেষ্টা করেছেন। অমিত শা বাংলার অনেক বাড়িতে গিয়ে পাত পেড়ে খেয়েছেন। বিদ্যাসাগর থেকে বিবেকানন্দ, হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুর, নেতাজি থেকে রবীন্দ্রনাথ, বাংলার অধিকাংশ সমাজসংস্কারক ও মনীষীকেই প্রায় দলীয় সম্পত্তি হিসেবে আত্মসাৎ করে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টায় ছিলেন বিজেপি নেতৃত্ব ও আইটি সেল। কিন্তু বাংলার ঐতিহ্যের যে উদার ও প্রগতিশীল ধারা বাঙালির মনন ও জীবনযাপনে মৈত্রী, ন্যায় ও যুক্তিবোধের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে সেই ধারা কখনোই জয় শ্রীরামের আগ্রাসী রণহুংকারে সায় দিতে পারে না।

বাংলার ইতিহাস বলতে বিজেপি মনে করে শুধু দাঙ্গা, দেশভাগ এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের স্মৃতি। যে স্মৃতিকে উসকে দিয়ে ঘা খুঁচিয়ে দিতে পারলেই ভোটের ঝুলি উপচে পড়বে। কিন্তু বাংলার ইতিহাস মানে পলাশীর যুদ্ধও, সেখানে বাংলার আপামর মানুষ সিরাজের পক্ষে, মিরজাফরের বিরুদ্ধে। রামায়ণের রামের নাম যতবার এ নির্বাচনে উচ্চারিত হয়েছে, পলাশীর ইতিহাসে মিরজাফরের ভূমিকার কথা তার চেয়ে কম স্মরণে আসেনি নিশ্চয়ই। বাংলার ইতিহাস মানে কৃষক বিদ্রোহ, তিতুমীর, ১৮৫৭-র ব্যারাকপুর আর মঙ্গল পান্ডে। বাংলার ইতিহাস মানে ক্ষুদিরাম আর চট্টগ্রাম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন আর মাতঙ্গিনী হাজরা। এই ইতিহাসে বিজেপি, আরএসএস-এর কোনও শেকড় নেই, ইতিহাসের অস্ত্রোপচার করে শেকড় উপড়ে ফেলে কৃত্রিম শেকড় পুঁতে দেওয়াটা কি সম্ভব?

সবশেষে বলি বাংলার বামপন্থার কথা। বামপন্থীরা গত দশ বছর ধরেই ক্ষমতায় নেই। অবশ্যই ভোট ক্রমাগত কমেছে, বিভ্রান্তি বেশ বেড়েছে। কিন্তু তা বলে তেভাগা আর নকশালবাড়ি আন্দোলনের বাংলা, সুকান্ত ও সলিল চৌধুরীর বাংলা একুশ শতকের এক স্বৈরাচারীকে চিনতে ভুল করবে? বাংলার যে বিশাল সংখ্যক সচেতন নাগরিক শুধু ভালোবেসে পত্রিকা বের করেন, থিয়েটার করেন, পরিবেশ বাঁচাতে ও বন্দিমুক্তির দাবিতে লড়ে যান, অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে ছুটে যান, তাঁরা ক্ষমতার লোভে অন্ধ নেতাদের আস্ফালন শুনেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন? এটা হওয়ার ছিল না, এটা হয়ওনি। শীতলকুচি হবে এই ধমকে বাংলা ভয় পায়নি, বাংলা রুখে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু বিধানসভায় বিরোধীপক্ষ বলতে এখন শুধু বিজেপি। প্রতীক্ষা তালিকা থেকে তাদের এখন আসন সংরক্ষণের অপেক্ষা। অন্যদিকে তৃণমূলের হাতে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আমরা দুশো পঁয়ত্রিশ, ওরা পঁয়ত্রিশ না হলেও, প্রায় কাছাকাছি। বাংলার রায়কে বিজেপি তো মানতে পারছেই না, সরকার কতটা সম্মান জানাতে রাজি, সেটাও দেখার ব্যাপার। বিধানসভার শূন্যতাকে তাই বামপন্থীদের ভরিয়ে দিতে হবে রাস্তায়। যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে, প্রতিদিনের সংকটে মানুষের সঙ্গে, মানুষের পাশে বামপন্থীদের অবশ্যই থাকতে হবে। আর বাংলা যেভাবে এবার রুখে দাঁড়াল, রুখে দিল, আগামীদিনে গোটা দেশ যেন এভাবেই রুখে দাঁড়াতে পারে। সেজন্য বাংলার এবারের এই প্রতিবাদী বার্তা ও চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে গোটা দেশজুড়ে। এখনই, একটু পা চালিয়ে।

(লেখক সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক)