ভোটে পাশ করলেই মন্ত্রী, ফেল করলে ছাঁটাই মোদি জমানায়

579

দেবদূত ঘোষঠাকুর

বিধানসভা ভোটে বাংলা দখলের পরিকল্পনা তাদের সফল হয়নি। তাই বলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মোটেই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে না। বরং লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে তারা আরও আটঘাট বেঁধে এগোচ্ছে। রাজ্যের অন্যতম অবহেলিত তিন জেলা কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং বাঁকুড়ার তিন সাংসদকে  মন্ত্রী করে এই বার্তা দিল বিজেপি।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ থেকে একসঙ্গে দুজন মন্ত্রী উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এতদিন ছিল কল্পনার অতীত! মনে রাখা দরকার, দার্জিলিংয়েj সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া বাদে আর কেউ কোনওদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হননি শিলিগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি থেকে।  সেটাই বাস্তব করল লোকসভা আর বিধানসভার ভোটের ফল।

নাগরিকত্ব আইন এই মুহূর্তে কার্যকর যে করা যাবে না তা বিজেপি নেতৃত্ব জানেন। এই অবস্থায় মতুয়া ভোট ধরে রাখতে ওইসব ভোটারকে মোদি-শার লাড্ডু শান্তনু ঠাকুরের মন্ত্রিত্ব। দক্ষিণবঙ্গে এবার বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া ভোটাররা কিন্তু বিজেপিকে নিরাশ করেননি।

 বাঁকুড়ায় বিজেপির বাড়বাড়ন্তের অনেকটা কৃতিত্বই সেখানকার সাংসদ ডাঃ সুভাষ সরকারের প্রাপ্য। তার পুরস্কার পেলেন তিনি।  লকেট চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ ঘোষ, বাবুল সুপ্রিয়, দেবশ্রী চৌধুরী, অর্জুন সিংরা লোকসভায় জেতা নিজেদের দুর্গ আগলাতে ব্যর্থ। তার খেসারত দিলেন বাবুল, দেবশ্রী।

ভোট পরবর্তী হিংসায় কোচবিহার-আলিপুরদুয়ারের বহু মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়েছিলেন অসমে। নিশীথ প্রামাণিক আর জন বারলাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় নিয়ে সেই সমর্থকদের পাশে থাকার বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি। আর এবারের নির্বাচনে বিজেপির লজ্জা বাঁচিয়েছে উত্তরবঙ্গ। বিশেষত দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার। নিশীথ আর বারলাকে মন্ত্রী করে তাই উত্তরবঙ্গের ওইসব এলাকার অবদানকে সম্মান জানাতে চাইছেন মোদি-শা।

 বিধানসভার ভোটে বিজেপির তিন সাংসদ লড়েছিলেন। জিতেছেন একমাত্র নিশীথ। পদত্যাগী মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় আর লকেট চট্টোপাধ্যায় হেরে গিয়েছেন। বাবুলের লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির ফল কিন্তু মোটেই ভালো হয়নি। সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুটিতে জিতেছে বিজেপি। লোকসভায় ফল ছিল সাতে সাত।

২০১৪ সালে উত্তরবঙ্গের একটি আসন থেকে জিতেছিল নরেন্দ্র মোদির দল। দার্জিলিংয়ে সাংসদ আলুওয়ালিয়াকে প্রথম দফায় মন্ত্রী করা না হলেও, ২০১৬ সালে তাঁকে রদবদলের সময় প্রতিমন্ত্রী করা হয়। দার্জিলিংয়ের সাংসদের মাটির টান ছিল না। কাজেই উত্তরবঙ্গের কোনও  লাভ হয়নি।

২০১৯ সালে উত্তরবঙ্গ ঢেলে ভোট দিয়েছিল বিজেপিকে। একজন আধামন্ত্রী ছাড়া আর কিছু পায়নি উত্তরবঙ্গ। তবে সেই প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী একজন মন্ত্রী হিসেবে কোনও দাগ ফেলতে পারেননি। যদিও প্রতিমন্ত্রীদের কাজটা কী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তা পরিষ্কার করে জানেন কি না সেটাই কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্ন। বিধানসভা ভোটের প্রচারে দেবশ্রী চৌধুরীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল দল। নিজের লোকসভা এলাকায় দলের সংগঠন যে তিনি মজবুত করতে পারেননি তা বিধানসভা নির্বাচনের ভোটের ফলেই পরিষ্কার। দেবশ্রীকে বোধহয় তাই সরতে হল।

উত্তরবঙ্গ থেকে কেউ কেন্দ্রে মন্ত্রী হলে তার সঙ্গে গনি খান চৌধুরীর তুলনা আসবেই। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিও এ ক্ষেত্রে গনির থেকে কয়েক যোজন পিছিয়ে। গনি খান চৌধুরী ও প্রিয়রঞ্জনকে পূর্ণমন্ত্রী করেছিল কংগ্রেস।  কিন্তু তারা গনি আর প্রিয়রঞ্জন ছাড়া আর কারও কথা ভাবেনি।

এবার বিজেপি বিধানসভা নির্বাচনে সাংসদদের ভালো পারফরমেন্সের পাশাপাশি রাজবংশী, আদিবাসী, মতুয়াদের প্রতিনিধিদের কথা ভেবেছে। তাঁরা যেভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার খোলনলচে বদলে দিলেন তাতে অনেকেরই ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের কামরাজ প্ল্যানের কথা মনে পড়ছে। সেবার দলে সংগঠনে জোর দিতে লালবাহাদুর শাস্ত্রী, মোরারজি দেশাই, জগজীবন রাম, বিজু পট্টনায়ক সহ একঝাঁক মন্ত্রী তাঁদের পদ হারিয়েছিলেন। হর্ষ বর্ধন, রবিশংকর প্রসাদ, প্রকাশ জাভরেকরের মতো একঝাঁক মন্ত্রীকে বসিয়ে দিয়ে কি সেই বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি?

(লেখক সাংবাদিক)