খেলা তো অনেক হল, ছেলেমানুষি অসৌজন্যের খেলা বন্ধ হোক এবার

467

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

ইনি আমাদের বলেছিলেন, খেলা হবে। উনি আমাদের বলেছিলেন, খেলা হোবে, বিকাশও  হোবে। নির্বাচনের ফল পর্যন্ত সবাই জেনে গিয়েছে এক মাস হল! আমরা দেখি, এ খেলা তো হয়ে চলেছে। কোভিড-ইয়াসের যন্ত্রণাময় পরিবেশেও এ খেলা চলছে নিরন্তর। এই খেলার কথাই কি ভোটের আগে বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী? বললে খুব দুঃখজনক। যে খেলাটা দুজনে খেলছেন, তাতে আর যাই হোক বিকাশ হবে না। এ পক্ষ একটা গোল দেয় অসৌজন্যের। ও পক্ষ একটা গোল দেয় অসৌজন্যের। গোলও বলা যায় বা দাবার চাল। ক্রমেই খেলাটা হয়ে ওঠে অসৌজন্য, প্রতিশোধস্পৃহা, দৃষ্টি ঘোরানো এবং ছেলেমানুষি নাটুকেপনার।

- Advertisement -

যেসব নাটুকেপনায় জনতা ক্লান্ত, বিরক্ত, ক্রুদ্ধ।নরেন্দ্র মোদির সরকার ভয়াবহ কোভিড পরিস্থিতির মাঝেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে তিন নেতাকে জেলে পাঠিয়ে দিল হঠাৎ। চক্ষুলজ্জাহীন সিদ্ধান্ত। কেননা বিজেপিতে নাম লেখানো মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারীর কথা তোলাই হল না। বিজেপি সমর্থকরা নির্বাচনের পর এতদিনে তপ্তি পেলেন। যাক, স্কোর ১-০। মমতার ধর্না, জনতার বিক্ষোভের পর রাজ্য সেদিনই জামিন আনল নেতাদের। তৃণমূল সমর্থকদের স্বস্তি, এতক্ষণে ১-১। সিবিআই সে রাতেই জামিনে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ পেয়ে গেল। স্কোর ২-১। মমতা ২-২ করলেন হাইকোর্ট মন্ত্রীদের মুক্তি দিয়ে দেওয়ায়। প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর সভায় শুভেন্দু অধিকারীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মোদির ৩-২।মমতা প্রধানমন্ত্রীর সভায় মুখ দেখিয়ে বেরিয়ে চলে এলেন। স্কোর যেন ৩-৩। তাতে হল কী? নবীন পট্টনায়েকের মতো মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে বেশি অর্থ আদায় করতে পারলেন না। সেই রাতেই মমতার দক্ষিণহস্ত আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নয়াদিল্লিতে বদলি করে ৪-৩ মোদির। গণতন্ত্র বলে আদৌ কিছু থাকলে তা মুচকি হাসবে এই সিদ্ধান্ত দেখে। বিজেপি নির্বাচনে হেরেই সিবিআই দেখাচ্ছে, গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে মুখ্যসচিবকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে। জিতলে কী খেলা হত?

স্কোরটা বড় নয়। এ কেমন খেলা যে শেষ হতেই চায় না? দুপক্ষ টানা ২২টি পেনাল্টি শটে গোল করে চলার পর ইউরোপা লিগ ফাইনালে হেরে যায় ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। বাস্তবের খেলা একবার শেষ হবেই। দুপক্ষ হাত মিলিয়ে মাঠ ছেড়ে চলে যায়। বিষাদ-আনন্দ এক হয়ে যায় কোথাও। রাজনীতির খেলা শেষ হবে কি? এখানে যে আনন্দ বা বিষাদ ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে কুৎসিত অসৌজন্য ও ভয়াল প্রতিশোধস্পৃহা।

এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির সঙ্গে খেলার স্কোরের তুলনাকে ছেলেমানুষি ভাবতে পারেন অনেকে। তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও বাংলা-দিল্লির এই টানাপোড়েন ছেলেমানুষির অধম। ছেলেমানুষিও এসবের কাছে ছেলেমানুষ। নির্বাচনের আগে মোদির ভাষণে দিদি-ইই, মমতার মুখে, নাড্ডা-চাড্ডা-গাড্ডা শুনে যেমন রুচিহীন ছেলেমানুষি মনে হত। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে একটা কথা বড় জীবন্ত হয়ে উঠছে। যা পদ্মপ্রাক্তনী যশবন্ত সিনহা বলেছিলেন মন্ত্রীরা গ্রেপ্তার হওয়ার রাতে, মোদি সরকার কিছুতেই মমতাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী এমন দুটো পদ, যেখানে তাঁদের দলের ঊধ্বের্র্ থাকা দরকার। কলাইকুণ্ডার বৈঠকে মোদি-দিদি দুজনেই দলের ঊধ্বের্র্ যেতে ব্যর্থ। প্রশ্ন উঠবে, প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রশাসনিক বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারীকে ডাকার কী দরকার ছিল?  প্রশ্ন উঠবে, শুভেন্দুকে দেখেই মমতার সভায় না যাওয়ার কারণটা কী? তিনি কি তাঁকে অহেতুক বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছেন না?

নির্বাচনের আগে অনেকের মুখে ঘুরেছে রাজনৈতিক একটা তত্ত্ব। মমতা নিজেই বিজেপিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছেন তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার বলতে বলতে। উত্তরবঙ্গেই বিজেপির রাজ্যস্তরের নেতা বলে কেউ ছিলেন না। সর্বত্র রাতারাতি দল পালটে আসা আদর্শহীন নেতা। অথচ মানুষের মুখে ঘুরেফিরে এসেছে পদ্মফুল। এটা মমতার লাগাতার পদ্মকে আক্রমণ করে চলারও ফল। মমতা বিরোধীরা ধরে নিয়েছেন, মমতাকে আটকাতে পারে শুধু বিজেপিই। শুভেন্দুর প্রাপ্য ছিল নির্মম উপেক্ষা। অযথা গুরুত্ব দিয়ে অজান্তে তাঁর আরও উপকার করে দিলেন মমতা।

শুভেন্দুর নাম লিখলেই অসমের ছবিটা মাথায় ঘোরে। সেখানে প্রথমে সর্বানন্দ সোনোয়াল, পরে হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে মুখ্যমন্ত্রী করে বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছে একটা জিনিস। মুখ্যমন্ত্রী পদে তাদের আরএসএসের ঘনিষ্ঠ লোককে বাছার বহু প্রচলিত উত্তর ভারতীয় তত্ত্ব বর্তমানে অচল। ক্ষমতায় আসতে পার্টি পালটে আসা আদর্শহীন লোকদের নায়ক বানাতেও বিজেপি দ্বিধাহীন। হিমন্তর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার উদাহরণ শুভেন্দুর পক্ষে টনিক।

হিমন্তর সঙ্গে শুভেন্দুর আরও একটা মিল। দুজনেই ইদানীং প্রমাণ করতে মরিয়া, তিনি আদি বিজেপি নেতাদের থেকেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী। বাংলায় সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধে পেয়েছে মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারই। সেই তথ্য চাপা দিতে শুভেন্দুর গলায় ঝাঁঝ এখন অনেক। তিনি জানেন, কাচের ঘরে থাকলে পাথর ছুড়তে হয় শটপাট চ্যাম্পিয়নের মেজাজে।

গণতন্ত্রের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিকতম কাজগুলোর পিছনে বিজেপির তিনটে স্ট্র‌্যাটেজি। জনতার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার খেলায় এমনিতেই মো-শা জুটি যেন মেসি-রোনাল্ডো। আপাতত মমতাকে বিরোধীহীন জাতীয় রাজনীতিতে চোখ রাখতে দেবে না তারা। সারাক্ষণ এমন কিছু করে চলবে, যাতে বাংলার মেয়ে বাধ্য হন বাংলাতেই আটকে থাকতে। দুই, প্রশাসনিকস্তরে মমতা যেভাবে আলাপনের মতো আমলাদের কাজে লাগিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ক্ষমতাহীন করার পথ নিয়েছেন, তা গুলিয়ে দিতে হবে। তিন, মমতাকে চটিয়ে উলটোপালটা বলাতে হবে, যাতে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে  সে সব কথাবার্তাই গুরুত্ব পায়।

দিঘায় দুদিন আগের প্রশাসনিক বৈঠকের কথাই ধরা যাক। বৈঠকের শেষদিকে মমতা জেলা শাসকের নাম ধরে বললেন, তুমি কিন্তু অসুস্থ, শরীরের যত্ন নিও। বেশি ঝুঁকি নিও না। বাড়ি থেকে না বেরিয়ে কাজ করা যায়। এমন আন্তরিকতা তাঁর ইউএসপি। দ্রুত লকডাউন করে রাজ্যের করোনা পরিস্থিতিও সামলাচ্ছেন ভালো। সব আড়ালে চলে যাচ্ছে সিবিআইয়ের অফিসে ধর্না ও মোদির সভা বয়কটের ঘটনায়। তাঁকে চটিয়ে এভাবে ভাবমূর্তি নষ্ট করা লক্ষ্য বিজেপির।

এমনিতে হারের পর সিপিএম, কংগ্রেস, বামফ্রন্টের শরিক দলের নেতাদের মতোই রাজ্য বিজেপি নেতারা হঠাৎ উধাও। মমতাকে ঘিরে ফেলার প্রাথমিক দায়িত্বটা মো-শা নিজে নিয়েছেন। সঙ্গী রাজ্যপাল ধনকর। যিনি কালীপুজোর দিন মমতার বাড়িতে সস্ত্রীক প্রসাদ খেয়ে এসে পরের দিনই মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকাশে ব্যঙ্গ করতে দ্বিধাহীন। ইদানীং টুইট প্রিয় রাজ্যপালের টুইটারে এক নতুন মোচড় যোগ হয়েছে। মমতার এক লাইন প্রশংসা করেই পরের লাইনে একটি পিঁপড়ে থাকবে। এতে তিনি কী প্রমাণ করতে চান? ধনকর শ্রীনিরপেক্ষ হতে চাইছেন? এসব শুনলে রাজভবনের ঘাস ও রেড রোডের ঘোড়ারাও হাসবে।

খেলা হবেতে ফের ফিরি। এ স্লোগানের আসল জনক বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সাংসদ শামিম ওসমানের বিরুদ্ধে অসংখ্য খুনের অভিয়োগ। ঢাকার কাগজেই পড়া, শামিম আসলে স্থানীয় ক্রিমিন্যালদের গডফাদার। ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম ছবির অভিনেত্রী সদ্যপ্রয়াত কবরী ছিলেন শামিমের আগে নারায়ণগঞ্জের সাংসদ। বাংলাদেশে রাজ্জাক-কবরী জুটি উত্তম-সুচিত্রার মতো জনপ্রিয়। খেলা হবের শামিম সেই কবরীকে পর্যন্ত মারতে গিয়েছিলেন প্রকাশ্যে। রাজনীতিকরা সব দেশেই সমান। শেখ হাসিনা পরে কবরীকে সরিয়ে সাংসদ করেন চরম বিতর্কিত গডফাদারকে। বুঝতেই পারছেন, খেলা হবের স্রষ্টার ইতিহাস কত কলঙ্কিত ওই বাংলায়। ইউটিউবেও দেখি, শামিম মোটেই ভালো অর্থে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি।
এই বাংলাতেও এমন অনেক খেলা হল। অসৌজন্যের, প্রতিহিংসার, দৃষ্টি ঘোরানোর, রুচিহীনতার, ছেলেমানুষির। এবার এ খেলাটা সত্যি সত্যি বন্ধ হওয়া দরকার।