সুশান্তের মৃত্যু রহস্যে পড়ে আছে শুধু শোলের সেই অমর সংলাপ

426

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

টুইটার, ফেসবুকে এক বছর আগের পুরোনো কিছু পোস্ট আজ স্ক্রল করে গেলে কখনও মনের কোণে বিষণ্ণতা জমা হয়, কখনও তীব্র রাগ। কোথাও এক চিলতে হাসি উঁকি মেরেই উধাও হয়ে যায় বহু দূরে। বহু রাজনীতিক এবং অভিনেতার সুশান্ত সিং রাজপুত সংক্রান্ত পোস্ট পড়লে এমন অনুভূতি তাড়া করে।

- Advertisement -

এই একটা বছর নেতা অভিনেতাদের আরও চারণভূমি হয়ে উঠেছে টুইটার। কিন্তু এটা যে কতটা সস্তা প্রচারের জন্য, তা দেখিয়েছিল সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু। তখন যে যা পেরেছেন, বলে গিয়েছেন। যুক্তি মানেননি। নতুন প্রজন্মের ভালোবাসা, লাইফস্টাইল ও যন্ত্রণার সংজ্ঞা মানেননি। নিজস্ব বোধবুদ্ধি প্রয়োগ করেননি। সব কিছুতে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলার অনিবার্য পথে হেঁটেছেন। আজ তাঁরা তাঁদের পুরোনো পোস্টগুলোর দিকে তাকাতে পারছেন? নিজেদেরই লেখা তীব্র ব্যঙ্গতে তাঁদের ভাসিয়ে দিচ্ছে না?

সুশান্তকে খুন করা হয়েছে, এই মতবাদীদের টুইট ও ফেসবুক পোস্ট যত লাইন বেরিয়েছে, সব জড়ো করলে দুটো জিনিস হতে পারে। কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্টের চুড়ো পর্যন্ত একটা মোটা দড়ি। নায়াগ্রা জলপ্রপাত পুরো ঢেকেও আরও বাকি থাকবে। কলকাতায় রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সাংসদ অভিনেত্রী দিনের পর দিন ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব দিয়ে পোস্ট করে গিয়েছেন কঙ্গনা রানওয়াত স্টাইলে। সিবিআই চাই, সিবিআই চাই।

আজ এক বছর পর কোথায় কী? যাবতীয় শূন্যতা ও নিঃস্তব্ধতা খেলা করছে আরব সাগরের পাড়ে, পাটনায় গঙ্গার ধারে। সিবিআই আসে, বিহার পুলিশ পৌঁছয়, ইডি নামে। সূত্রকে উদ্ধৃত করে বহু খবর লিখেছেন বহু সাংবাদিক। অজস্র তত্ত্ব, অজস্ত্র এক্সক্লুসিভ। আজ ভারত দেখছে, সব ফক্কা।

ওই সময় এক প্রবাসী বাঙালি অভিনেত্রীকে রাতারাতি খুনি প্রমাণ করে দিয়েছিল কয়েক কোটি মানুষ। সর্বভারতীয় টিভি অ্যাঙ্কররা অধিকাংশ হয়ে উঠেছিলেন বিচারক। তাঁরা যেন রিয়া চক্রবর্তীকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না। স্রেফ সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রমাণের চেষ্টা হত, রিয়া খুনি। কোন সূত্র কেউ জানত না।

মনে গেঁথে আছে সেই ছবিটা- রিয়া থানা থেকে বেরোচ্ছেন এবং তাঁকে বুম হাতে তাড়া করেছেন অজস্র ক্যামেরাম্যান। হাত জোড় করে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রিয়া। রাতারাতি অজস্র প্রচার নিয়ে চলে গিয়েছেন সুশান্তের প্রথম প্রেমিকা, সুশান্তের দিদি। ঠিক হয়ে যায়, পাটনায় সুশান্তের বাড়িতে মিউজিয়াম হবে। সেখানে কি কেউ যায়? হয়তো যায়, হয়তো যায় না।  কিন্তু আদৌ কি সেটা চালু?

যে অভিনেতা অভিনেত্রী এবং সাধারণ মানুষ সে দিন রিয়ার গ্রেফতারে পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছিলেন, একটা সাধারণ দিক ভুলে গিয়েছিলেন তাঁরা। রিয়া শেষমেশ গ্রেফতার হন ড্রাগ রাখার অপরাধে এবং সেই গ্রেফতারে সবচেয়ে অপদস্থ সুশান্তের ভাবমূর্তিই। তাঁর ধোনি, কেদারনাথ, ছিছোঁড়ে, কাই পো চে, ব্যোমকেশ বকসি, সোনচিরিয়ার দুরন্ত অভিনয় চলে গিয়েছে আড়ালে, সম্পূর্ণ আড়ালে। রিয়ার জেল মানে সুশান্তেরই জেলে যাওয়া। দুজনেই একদোষে দুষ্ট।

ওই সময় রিয়ার জন্য টার্গেট হয়ে যান বাঙালি মেয়েরাও। রিয়া হয়ে ওঠেন ডাইন। তোপের মুখে পড়েন অনেক পরিচালক, অভিনেতা। এখন বোঝা যাচ্ছে, কোনও বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চটজলদি মতপ্রকাশ কী বিপজ্জনক খেলা। তাতে অবশ্য কারও দিব্যদৃষ্টি খুলেছে বলে মনে হয় না।

সুশান্তের মৃত্যুরহস্য ভেদ করতে সিবিআইকে টেনে আনার ফলে উলটে আলোয় চলে আসে তাঁর বেহিসেবি জীবন। সারা বিশ্ব জেনে গিয়েছে দুটো মর্মান্তিক তথ্য। এক, তিনি নিয়মিত বান্ধবী পাল্টেছেন, একজনের সঙ্গে প্রেম করতে করতে অন্যজনের সঙ্গে বিদেশ গিয়েছেন দিব্যি। দুই, বন্ধুবান্ধবী নিয়ে নিয়মিত নেশার ঠেক বসাতেন তিনি।

সোমবার সুশান্তের মৃত্যুর এক বছর পূর্তিতে নজরে এল, তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা অঙ্কিতা লোখান্ডে বর্তমান বয়ফ্রেন্ড ভিকি জৈনের সঙ্গে সহাস্য ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, পারফেক্ট টুগেদার। সঙ্গে সৈকতে নিজের দুটি পোজ দেওয়া ছবি। যে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় সুশান্তের ছবি দিয়ে প্রতিদিন বিচারের দাবি তুলতেন টুইটারে, মাঝে উচ্চবাচ্যই করেননি। গত দুদিন তাঁর হঠাত্ মনে পড়েছে ‘বেটা’কে। আর বিদ্রোহের ডাক নয়, তাঁর সুশান্ত সম্পর্কিত পোস্ট অতি নিরামিষ। বরং শেষতম পোস্টে আক্ষেপ, রাজনীতিকে গ্ল্যামারাইজ করে লাভ নেই। অনেক রক্ত ঝরলেও কেউ পাশে থাকে না। কাকে বলছেন তিনি? নিজের দলের নেতাদের?

আসলে সুশান্তের মৃত্যু হঠাৎই হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতির পাশার চাল। যা এখন সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট। সামনে তখন বিহারের নির্বাচন। বিহারপুত্তরের অসহায় মৃত্যুকে ভোটের প্রচারে লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল। অস্বস্তিতে পড়লে নজর ঘোরানো বিজেপির চিরন্তনী ট্রেডমার্ক। বিজেপির ব্যর্থতা ভুলে অন্যদিকে তাকানোর সুযোগ ছিল সুশান্তের প্রতি অবিচারের দাবিতে।

খেয়াল করে দেখবেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা সুশান্তকে হত্যার তত্ত্ব খাড়া করতেন, সবাই বিজেপি সমর্থক। সুশান্ত সংক্রান্ত পোস্ট দেখলেই আন্দাজ মিলত, কে বিজেপি সমর্থক, কে বিরোধী। প্রথম পক্ষ জড়িয়ে দিচ্ছিল শিবসেনা সরকারকেও। ঠাকরেরা নাকি মৃত্যুর তদন্ত করতে দিচ্ছেন না, উদ্ধব ঠাকরের ছেলেও হত্যায় জড়িত!  এক বছর পর সব তত্ত্ব ভ্যানিশ।

যে মেয়েরা কুচক্রী, ধান্দাবাজ রিয়াকে প্রতিদিন অকথ্য গালাগাল দিতেন, রাতারাতি উবে গিয়েছেন তাঁরাও। ২০২০ সালে সর্বভারতীয় নামী কাগজ দেশের মোস্ট ডিজায়ারেবল উওম্যান-এর স্বীকৃতি দিয়েছিল রিয়াকে। আজ তাঁর কাজ খুব কম। তবে নীরব আভিজাত্য নিয়ে তিনি সামলেছেন দুঃসহ মিডিয়া ট্রায়াল, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিপর্যয়। মনে পড়ছে, তাঁর প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট কর্নেল বাবা ইন্দ্রজিতের বিদ্রুপাত্মক বিবৃতি, ধন্যবাদ ভারত। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার জন্য। জয়হিন্দ!

জীবন কত অতর্কিতে নদীর মতো বাঁক নেয়!
বিজেপি-বিজেপি বিরোধী দ্বন্দ্বের পাশে আত্মহত্যার তত্ত্বে আরেক প্রসঙ্গ বহু আলোচিত ছিল। তাঁর মানসিক অবসাদ এবং এই অবসাদের দায়ে বন্দুক রাখা হত কিছু নেতা, পরিচালক, অভিনেতাদের ঘাড়ে। এক কাল্পনিক চক্র বানিয়ে আমরা ভারতীয়রা প্রতি ক্ষেত্রে একটা করে যুদ্ধ তৈরি করতে ভালোবাসি। অমুক বনাম তমুক। এখানে অদৃশ্য যুদ্ধ তৈরি করা হয় সাধারণ অভিনেতা ও স্টারকিডসদের মধ্যে। সুশান্ত নাকি তাঁদের জন্য কাজ না পেয়ে পেয়ে হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন।

এখানেই একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছে জাগে।! যত হিট ছবি ছিল বছর চৌত্রিশের সুশান্তের, তা কজন স্টারপুত্রের ছিল? রণবীর কাপুর বা অভিষেক বচ্চন বা অক্ষয় খান্নারই বা পাঁচ বছরে কটা হিট ছবি? সুশান্তের হতাশার কোনও কারণই ছিল না। সম্ভবত তিনি ছিলেন প্রবল উচ্চাকাঙ্খী। এমন অল্পে তুষ্ট না হওয়া আর বদসঙ্গ অনেককে ডুবিয়েছে সমাজের নানা ক্ষেত্রে। তারই শিকার হতে পারেন সুশান্ত। আর কোনও রহস্য দেখা যাচ্ছে না তো!

মিডিয়া ট্রায়ালের বিচারকদের প্রবল কুৎসিত চিৎকার থেমে গিয়েছে কবেই। থেমে গিয়েছে সিবিআই তদন্তের ডাক। থেমে গিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকারের ষড়য়ন্ত্রে সোচ্চার হওয়ার ডাক। সিবিআই, ইডি, বিহার পুলিশকে এনেও যখন রিয়ার অপরাধের প্রমাণ মেলেনি, তখন ডাক পড়ে নার্কোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর। রিয়াকে ধরা হয় ড্রাগ কেচ্ছায় জড়িয়ে।

নিছক মুখরক্ষা, কিন্তু কেউটে মারতে গিয়ে কেঁচো ধরার ব্যাপার। বলিউডে যেন কেউ ড্রাগ নেন না! কোন সুপারস্টার মাঝরাতে ঢুলুঢুলু চোখে প্রেস মিট করেই মুহূর্তে চনমনে হয়ে যান? কোন সুপারস্টারের বউ স্বামীর জন্য ড্রাগ আনতে গিয়ে এয়ারপোর্টে ধরা পড়েন? কত পার্টিতে ড্রাগের বন্যা হয়? নার্কোটিক্স কর্তারা কি জানেন না? সবই জানেন।

দোষ কারও নয় গো মা। দোষ হয়তো শুধু রিয়ার। সুশান্তকে যে তখন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন বঙ্গললনা।
এই ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নেই রহস্যের পুরো প্রেক্ষাপটে। সব শূন্যতা। অভিনেতা এ কে হাঙ্গল বেঁচে থাকলে শোলে ছবিতে তাঁর প্রবাদপ্রতিম সংলাপটা ব্যবহার করতেন, ইতনা সন্নাটা কিঁউ হ্যায় ভাই?