কংগ্রেসের সংকটের মূলে শোনার সংস্কৃতির অবলুপ্তি

657

রাজীবজির আমলে তাঁর জনতা দরবারে হাজির থাকার সুযোগ আমার ছিলফলে অনেক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরেছিঅনেক ক্ষোভ প্রশমিত হতে দেখেছিঅভিমান ভুলে নতুন উদ্যমে কাজ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেও দেখেছিকারও কখনও মনে হয়নি যে, তাঁকে স্তোকবাক্য শোনানো হচ্ছেলিখেছেন দেবপ্রসাদ রায়

১৯৮২ সালে একবার সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির যুব শাখার (কনসমল) ডেলিগেশনকে ইন্দিরাজির সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল, সময়টা ছিল সকালবেলা। সাক্ষাতের স্থান ১, আকবর রোড। ফলে ওরা যখন দেখা করে বেরিয়ে আসছে, তখন বাইরের লনে হাজারখানেক লোক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ভিড় দেখে বিস্মিত দলের নেতা আকশুয়োনভ জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে এত ভিড় কেন? আমি বললাম, এঁরা সব সাক্ষাত্প্রার্থী, এখন ম্যাডাম এঁদের সঙ্গে দেখা করবেন। ওঁদের বিস্ময়ের ঘোর আরও বেড়ে গেল।

- Advertisement -

-তোমাদের প্রধানমন্ত্রী রোজ এত লোকের সঙ্গে দেখা করেন?

আমি বললাম, উনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, আবার দলেরও সভাপতি। তাই সবার কথা শুনতে হয়।

আকশুয়োনভ বললেন, আমরা তো ভাবতেই পারি না। রাষ্ট্রপ্রধানকে যদি রোজ এত লোকের সঙ্গে দেখা করতে হয়, তবে দেশ চালাবেন কখন।

-তোমাদের কি মনে হয় উনি দেশ চালাতে পারছেন না।

না না, তা বলিনি। বলে উঠলেন আকশুয়োনভ। তাঁর বক্তব্য, আমাদের দেশে এরকম ভাবতেই পারি না, আমি সেটাই বলতে চেয়েছি।

আমি কখনও জানার চেষ্টা করিনি, নেহরুজি বা শাস্ত্রীজি এরকম জনতার দরবার-এ বিশ্বাস করতেন কিনা। কিন্তু আমার দেখা ইন্দিরাজি, রাজীবজি, নরসীমা রাও ও মনমোহন সিংয়ের নেতত্বাধীন কংগ্রেস দল বা সরকারের স্থায়িত্বের প্রশ্নে এই জনসংয়োগ ইউএসপি হিসেবে কাজ করেছে।

মানুষের বা দলের কর্মীদের চাওয়া-পাওয়া, ক্ষোভ-অভিমান উগরে দেওয়ার এই ব্যবস্থা দলের একটি স্বীকৃত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। ১৯৯২-এর পর থেকে আমি দিল্লিতে গোল মার্কেটে আমাদের এনজিও-র অফিসেই বসতাম। একদিন নাংলই থেকে কংগ্রেসের পুরোনো কর্মী রাজু সারসর সন্ধেবেলায় ভীষণ উত্তেজিত হয়ে এলেন। তখন দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। রাজু ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, এবারও সজ্জনকুমার আমাকে টিকিট না দেওয়ার ফন্দি আঁটছে। এবার আমি একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়ব। আমি বললাম, তোমার যন্ত্রণা আমি বুঝি, কিন্তু গত চারবছর ধরে আমি তো দলের কোনও দায়িত্বে নেই। আমি কী করতে পারি বলো।

উনি বললেন, কুছ নেহি, আপ স্রিফ ফোন করকে পতা কর লিজিয়ে কেশরীজি ঘর পে হ্যায় কি নেহি। ম্যাঁয় ওহি যা কে দেখতা হুঁ। তখন সীতারাম কেশরী দলের সভাপতি। ভালোমন্দ কোনও বিশ্লেষণে না গিয়ে বলি, উনি কর্মীদের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে খুব উদার মানসিকতার ছিলেন। অফিস কিংবা বাড়ি, কেউ দেখা করতে গিয়ে কেশরীজির কাছ থেকে  বিমুখ হয়ে কখনও ফিরে আসেননি। এই গুণটি প্রণব মুখোপাধ্যায়েরও ছিল। তাঁর বাড়ির অফিসে রাত বারোটাতেও সাক্ষাত্প্রার্থীদের জন্য দরজা খোলা থাকত। বরং উনি অফিস থেকে উঠে যাওয়ার আগে নিজেই হিরাকে (পিওন) ডেকে জিজ্ঞাসা করতেন, কেউ বাকি থেকে যায়নি তো।

যাই হোক কেশরীজি বাড়ি আছেন শুনে রাজু তক্ষুনি রওনা দিলেন। ঘণ্টা দুয়েক পরে ফিরে এলেন। আগের সেই উত্তেজিত চেহারাটা আর তাঁর নেই। ওঁর চেহারার পরিবর্তনে জিজ্ঞাসা করলাম, মনে হয়, তোমার টিকিট নিশ্চিত করে এলে। রাজু বললেন, না টিকিট হয়নি, তবে আমার আর কোনও ক্ষোভ নেই। আমি বিশদে জানতে চাইলে উনি বললেন, ক্ষোভের কথা বলতে বলতে অভিমানে কেঁদে ফেলেছিলাম। কেশরীজি তখন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমার থেকেও জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন। এরপর আমার কি কোনও ক্ষোভ থাকতে পারে? আমিও ভাবলাম ঠিকই, এরপর আর কোনও ক্ষোভ থাকার তো কোনও কারণ নেই। কজন তৃণমূলস্তরের কর্মীর দুঃখে সর্বভারতীয় সভাপতি চোখের জল ফেলেছেন। এ তো টিকিট পাওয়ার চেয়ে বেশি পাওয়া।

রাজীবজির আমলে তাঁর জনতা দরবারে হাজির থাকার সুয়োগ আমার ছিল। ফলে অনেক ঘটনার সাক্ষী হতে পেরেছি। অনেক ক্ষোভ প্রশমিত হতে দেখেছি। অভিমান ভুলে নতুন উদ্যমে কাজ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেও দেখেছি। কারও কখনও মনে হয়নি যে, তাঁকে স্তোকবাক্য শোনানো হচ্ছে। বিহারের খাগারিয়া থেকে ১৯৮৪ সালে এমপি হয়েছিলেন ডাঃ সিএস ভার্মা। ১৯৮৯ সালে কিন্তু তিনি টিকিট পাননি। একদিন সকালবেলা ৭, রেককোর্স রোডে জনতা দরবারে হাজির হয়েছেন। ডাক্তার সাহেব নর্থ অ্যাভিনিউয়ে থাকতেন বলে আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। উনি রাজীবজির সঙ্গে দেখা করে বেরোনোর আগে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলেছিলেন, জানতে হো রাজীবজি কো পতাই নেহি থা কি মেরি টিকিট কাট গিয়া। আমি সহানুভূতি প্রকাশ করে আলোচনার ইতি টেনে দিলাম। কারণ আর এগোনো ঠিক হত না।

অন্ধ্রপ্রদেশের আলুরি সুভাষচন্দ্র বোস ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত লোকসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৯০-এ একটা কর্মসূচিতে হায়দরাবাদে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ায় জানলাম, উনি তখন এমএলএ। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, হঠাৎ এই অবনমনের ইচ্ছা হল কেন? সুভাষ বললেন, ইচ্ছা করে কেউ নামে? শুনলাম, সে এক বিরাট কাহিনী। ১৯৮৯ সালে টিকিট হবেই ধরে নিয়ে কোথাও দৌড়োদৌড়ি না করে এলাকায় তিনি কাজ করছিলেন, যাতে আরও বেশি ভোটে জেতা যায়। এআইসিসি প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করার পর দেখা গেল, ওঁর আসনে অন্য প্রার্থী। সুভাষ ছুটে দিল্লি গিয়ে রাজীবজির সঙ্গে দেখা করতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার এখন শরীর কেমন? সুভাষ বললেন, কেন, আমি তো ভালোই আছি। রাজীবজি শুনে বিস্মিত হয়ে বললেন, সে কী? তোমার স্ত্রীর টেলিগ্রাম এসেছিল যে তুমি মৃত্যুশয্যায়, তোমাকে যেন কোনও অবস্থায় টিকিট দেওয়া না হয়। তার জন্যই তো অন্য প্রার্থী দেওয়া হল। ফলে সুভাষ পরে হয়ে গেলেন এমএলএ। কারও কখনও মনে হয়নি, একবার যাচাই করে দেখি তো। যা শুনছি, তাই ঠিক না নেপথ্যে অন্য গল্প আছে। কংগ্রেসে কোনওকালেই সর্বোচ্চ নেতত্বের বিশ্বাসয়োগ্যতা নিয়ে কখনও কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এই প্রক্রিয়াটায় ছেদ টেনেছিলেন বলেই নরসীমা রাও অনেক ভালো কাজ করেও আর ফিরে আসতে পারেননি। যদিও বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে না পারা তাঁর পরাজয়ের একটা বড় কারণ বলে মনে করা হয়।

মনমোহন সিংকে এই দাযিত্ব পালন করতে হয়নি। কারণ, সেসময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও সোনিয়াজি দলের সভাপতি ও ন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। ফলে দলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যে সোনিয়াজি, মনমোহন সিং নন, তা বুঝতে কারও কোনও অসুবিধা হয়নি। সোনিয়াজিও দলের পরম্পরা মাথায় রেখে জনসংযোগ বজায় রেখেছিলেন। কংগ্রেসে নবীন বনাম প্রবীণের সমস্যা নতুন কিছু নয়। ১৯৭৭-এ এই রাজ্যে সঞ্জয়জির ঘনিষ্ঠরা চেয়েছিলেন প্রিয়দা, মায়া রায় প্রমুখ যেন লোকসভা নির্বাচনে টিকিট না পান। সঞ্জয়জির তাতে সায় থাকলেও ইন্দিরাজি সেই দাবি মানেননি। তার ফলে সঞ্জয়জি না চাইলেও দুজনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছিলেন। ১৯৮৪ সালে জাতীয় এবং রাজ্যস্তরের ১৩ জন যুব কংগ্রেস নেতত্বকে রাজীবজি একসঙ্গে রাজ্যসভায় নিয়ে এসেছিলেন। সবার পথ মসৃণ ছিল না। করুণাকরণ কেরল থেকে পানিক্করকে আসন ছাড়েননি। রাজীবজি তখন ওঁকে ওডিশা থেকে নির্বাচিত করে নিয়ে এসেছিলেন। আমার মনোনয়নও অত সহজে হয়নি। ইন্দিরাজি আমার নাম শুনে রাজীবজিকে বলেছিলেন, ওকে রাজ্যের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী চাইছেন না। তাঁকে অসন্তুষ্ট করে আমি কী করে তোমার প্রার্থীকে সাহায্য করব? রাজীবজি সেই মন্ত্রীর বাড়ি গিয়ে দেখা করে বলেছিলেন, আপনার ডিপিকে নিয়ে সমস্যা কোথায়! উনি বললেন, ও রাজ্য-রাজনীতিতে আমার বিরোধী শিবিরের লোক। আমি নিশ্চিত যে ও এমপি হয়ে আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে। রাজীবজি ওঁকে বলেন, আমি কথা দিচ্ছি, রাজ্য-রাজনীতিতে ডিপি-র কোনও ভূমিকাই থাকবে না। ওঁকে দিল্লিতে প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করব। পরবর্তীতে সেই মন্ত্রী আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আমি রাজীবকে বলেছি, তোকে নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নেই।

সেইদিনগুলির সঙ্গে আজকের তফাত হল, সেসময়ে দলে ইন্দিরাজি ও সঞ্জয়জির দুটি আলাদা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে অথবা ইন্দিরাজি ও রাজীবজি দুজনে দুইটি আলাদা গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, এমন প্রচার করার সুযোগ কোনও সংবাদমাধ্যম পায়নি। এখন রাজ্যের অথবা সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের একাংশকে দেখি, সোনিয়াজি ও রাহুলজির দুইটি আলাদা গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা বারবার লিখে বিষয়টিকে একটি অন্ধকার ঘরে অস্তিত্বহীন কালো বিড়াল খোঁজার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। এই বিভ্রান্তি সম্ভবত মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে এই কারণে যে, ইন্দিরাজির সময় থেকে ইউপিএ-১ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতত্বের কাছে নিজের সমস্যা, অভিমান, অভিয়োগ বা ক্ষোভ জানানোর যে প্রক্রিয়া আপাদমস্তক গোষ্ঠী রাজনীতিতে জর্জরিত হয়ে কোনও অশোক কানওয়ার বা কোনও শচীন পাইলটকে দল ছাড়ার ছুতো জোগায়নি। কারণ, সীতারাম কেশরীর মতো রাজুকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে না কেঁদে উঠলেও সহানুভূতির সঙ্গে কথা শোনার দরজা তখনও বন্ধ হয়নি। আর এখন অসুস্থতার কারণে সোনিয়াজি দেখা করেন না। রাহুলজি পদে নেই বলে দেখা করেন না। বাকি যাঁরা ২৪, আকবর রোডে বসেন, তাঁরা শোনেন মন দিয়ে। তবে সব শুনে বলেন, আপ কো ইয়ে সারে বাতেঁ সোনিয়াজি অউর রাহুলজি কো বোলনা চাহিয়ে। কংগ্রেসের অধুনালুপ্ত এই শোনার সংস্কৃতির যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ সোনিয়াজি ও রাহুলজির মাঝেও বিভাজন রেখা টানার চেষ্টা করছে। কংগ্রেস দলে আদর্শের টানে যত না কর্মীরা বাঁধা পড়েন, তার থেকে অনেক বেশি বাঁধা পড়েন সম্পর্কের টানে। দেখাই যদি না হয়, তবে সম্পর্ক গড়ে উঠবে কী করে!

করোনা আবহে দুটি ঘটনা বারবার ফিরে ফিরে আসছে। অমিতাভ বচ্চন করোনা সংক্রামিত। দেশের নানা প্রান্তে পুজোপাঠ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের উদ্বেগের কথা যত শুনতে পাচ্ছি, বিনা চিকিৎসায় মৃত শুভ্রজিতের জন্য তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পেলাম না। উদাসীনতা ও অবজ্ঞার প্রতিকার চাইতে শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। শচীন পাইলটকে নিয়ে কংগ্রেসের জাতীয় রাজনীতি কয়েদিন ধরে সরগরম। ফেরানোর চেষ্টা এখনও অব্যাহত। কিন্তু সাক্ষাতের দরজা বন্ধ দেখে যে তৃণমূলস্তরের কর্মীরা ব্যথা জানাতে এসে আরও ব্যথাতুর হয়ে ফিরে গেলেন, তাঁরা বাড়িতেই ফিরলেন তো? শচীন পাইলটকে ফেরানো যতটা প্রাসঙ্গিক, তার থেকেও বেশি প্রাসঙ্গিক কংগ্রেস দলের সংস্কৃতিটা ফেরানো। জনসংযোগের সেই সংস্কৃতি, যা কংগ্রেস দলের আসল ইউএসপি।

(লেখক রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ)