বঙ্গজ নেতাদের আরও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বেরোবে বন থেকে টোপর মাথায় দিয়ে

211

রূপায়ণ ভট্টাচার্য :  কিংবদন্তি গায়ক তারাপদ চক্রবর্তী একদা গেয়েছিলেন, ফুলে ফুলে কী কথা। সুপারহিট রাগপ্রধান গান সে আমলের। বাংলার এই নির্বাচন দেখে মনে হবে, ফুলে ফুলে আবার কীসের কথা? ফুলে ফুলে মানে তো আসলে বোমা বা বাঁশপেটা-থাপ্পড়। কথা তো বলবে গুলি-লাঠি এবং চড়-থাপ্পড়। ফুলে ফুলে রোমান্টিক কথা আর হবে না বঙ্গজীবনে। ভ্রমর বা মৌমাছিও আসবে না ফুলে। তাদের কথা বলতে দেওয়াও হবে না। গাইতে দেওয়া হবে না টোড়ি রাগে কোনও গান।

বিজেপির পদ্মফুল ও তৃণমূলের ঘাসফুলে আপাতত কোনও সৌন্দর্য নেই। শুধু অশ্লীল আক্রমণের হিসহিস শব্দ রয়েছে। যে ধ্বংসাত্মক ব্যাপার একদা ছিল সিপিএমের কাস্তেতে। নির্বাচনের বাংলায় মহিলা প্রার্থীদের যে ভঙ্গিতে লাঠি নিয়ে তাড়া করা হল, সপাটে চালানো হল চড়, তাতে এক বিষণ্ণ সিদ্ধান্তে আসা যায়। বাংলায় সর্বনাশের আর বাকি নেই। ভোটের সংস্কৃতিকে লুম্পেন সংস্কৃতিতে পালটে দেওয়ায় একশোয় একশো পাবেন বঙ্গজ নেতা-নেত্রীরা।
ভোটবঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তে এখন অন্য তিনটি স – সাম্প্রদায়িকতা, সিন্ডিকেটবাজি ও সুবিধাবাদ। দুতিনটি প্রাণ গেলেও এতে যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বাংলা। আমরা মেনে নিচ্ছি অতি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে।

- Advertisement -

গত মাসকয়েক সব পার্টির নেতারা যেভাবে মধুরবচন বিলি করে গিয়েছেন, তাতে এমন লাঠ্যৌষধি অনিবার্যই ছিল। বঙ্গনেতারা ভদ্রতার লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করে গিয়েছেন অনেকদিন। কেউ তাঁদের বারণ করেনি, কেউ তাঁদের নিন্দায় ভরিয়ে দেয়নি। শিক্ষা এবং রুচিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে গালাগাল দিয়ে এঁরা সংলাপ উচ্চগ্রামে তুলেছেন। জনতা হাততালি দিয়েছে এবং নেতারা ভেবেছেন, এটাই আসল পথ। বুঝতে পারেননি, আস্তে আস্তে তাঁদের অজান্তে তৈরি হয়ে গিয়েছে ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইন। বন থেকে টোপর মাথায় দিয়ে এমন ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইন আরও বেরোবে। মাতবে নেতাদেরই ধ্বংসের খেলায়।

বছরকয়েক আগে সিপিএমের তাড়ায় ধানখেতে ধুতি তুলে প্রাণ বাঁচাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে হয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইয়াকে। তখন অন্য পার্টির নেতারা মজা পেয়েছিলেন। মঙ্গলবারও পাপিয়া অধিকারী বা সুজাতা মণ্ডলের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় দেখলাম না, বিরোধী পার্টির নেতারা কেউ তীব্র নিন্দা করলেন। অন্তত ফোন করলেন সৌজন্য দেখিয়ে এটাও খুব ভয়ংকর বিপজ্জনক প্রবণতা। ভদ্রতা দেখানো দুর্বলতার পরিচয় নয়। মমতা-দিলীপ-অধীর-সূর্যরা কেউ এটা বুঝেও বুঝছেন না।

আমাদের নেতারা সৌজন্যবোধ হারিয়েছেন। আমাদের ভোটাররা নেতাদের অনুসরণ করতে গিয়ে হারিয়েছেন ভদ্রতাবোধ। যে কারণে বাংলার নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিহার, উত্তরপ্রদেশের পুরোনো দিনের নির্বাচন বা তার চেয়ে খারাপ। ওই দুটো রাজ্যের ভোট যখন বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হত ভারতের অন্য রাজ্যে, তখনও কোনও মহিলা প্রার্থীকে এভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়নি। তখনও মহিলা ভোটারদের লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়নি অশান্তি তৈরির জন্য।

এই নির্বাচন আরও একবার দেখিয়ে দিল, বাঙালির সত্যিই কোনও নীতি বা আদর্শ নেই। বাঙালির নিজস্ব ভাবনাও নেই। যা রয়েছে, তা অতীতের গৌরবগাথার জাবর কাটা। কবে কী ঘি খেয়েছি, তা ভেবে আর কী লাভ? বর্তমান তো ঝুলছে চড়ান্ত অ-সংস্কৃতির ওপর। বাঙালি আয়ারাম-গয়ারাম হয়ে গিয়েছে। বাঙালিও গুন্ডাগর্দি, মস্তানরাজে অভ্যস্ত আজ।

রাজ্যের ভোটে সব পার্টির নেতারা ইদানীং বলে যাচ্ছেন, লজ্জা, লজ্জা, লজ্জা। দেখলাম, জয়া বচ্চনও বাংলায় এসে এই ধরনের সংলাপ বলেছেন। লজ্জা কীসের? আসল লজ্জা হল, এইসব নরকের কীট ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করে বাংলায় ছেড়ে দেওয়া। এরাই দীর্ঘদিন রাজত্ব করবে। এরাই কেউ গ্রামীণ নেতা হবে। এরাই কেউ পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৈরি করবে অশান্তির বাতাবরণ। ক্ষমতা ছাড়বে না। দাদাদের হাততালি কুড়োবে।

এরাই কেউ সিতাইয়ের মানসাই নদীর ওপর আরেকটা ব্রিজ হলে কনট্রাক্টরির টাকা লুটবে। দোমোহনিতে তিস্তার পাশে রাস্তা হলে মালপত্র সাপ্লাই করবে। এরাই কেউ উত্তরবঙ্গে জঙ্গলের কাঠ বা ভেষজ সামগ্রীর বেআইনি ব্যবসা চালাবে মন্ত্রীর সাহায্য নিয়ে কেউ নাকতলার মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রোমোটিং ব্যবসা করবে, একই লোককে দুবার বাড়ি বিক্রি করে। কেউ নিউ আলিপুরে কাউকে পুরোনো বসতবাড়ি বিক্রির জন্য চাপ দেবে মন্ত্রীর আত্মীয় হয়ে কেউ শিলিগুড়ি বা আলিপুরদুয়ারে বালাসন বা সংকোশ নদীর বালি-পাথর বিক্রি চালিয়ে যাবে আইন ভেঙে। পাড়ায়, স্টেশনে বা বাসস্ট্যান্ডে অক্লেশে তোলা তুলবে গরিব দোকানদারের কাছে। মন্ত্রীরা, বিরোধী নেতারা চোখে ঠুলি পরে বসে থাকবেন। টিভিতে বুমের সামনে ভালো ভালো কথা বলে যাবেন। শিশু বা বৃদ্ধদের সঙ্গে সহাস্য সেলফি তুলবেন ভোটের সময়।

চৌত্রিশ বছরের শাসনকালের মাঝামাঝি সময়ে ভোটের এই লুম্পেন সংস্কৃতি তৈরি করেছিল সিপিএম। এখন তৃণমূল এবং বিজেপি অন্ধের মতো মেনে চলেছে সেই সংস্কৃতি। পালটাতে চায়নি। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে। আরও তীক্ষ্ন করেছে অসভ্যতার ফলাকে।

অনেকদিন ধরে ভোট করানো বলে একটা শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছে বাংলার নির্বাচনে। ভোটের দিন এর প্রয়োগ অনিবার্য। এটাই বাংলার সাম্প্রতিক রাজনীতির সর্বনাশের মূলে। ভোট করানো মানে কী? বিপক্ষকে ভোট দিতে না দেওয়া। নিজেদের অনুকূলে সব ভোট নিয়ে ফেলা। মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ নেতার পারলে সব ভোট চাই। তার জন্য বুথে বুথে লোক পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অল্প ভোটে জিতলে এই নেতা ও তাঁর ভ্রাতৃকুল তপ্ত হন না।

সেই বেনোজলেরা সিপিএম থেকে ক্ষমতার লোভে তৃণমূলে গিয়েছে, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাচ্ছে। তাদের ভাবনা তাই এক্কেবারে এক। যে কোনও মূল্যে ক্ষমতাভোগ। অল্পে এরা তুষ্ট হওয়ার নয়। সব পার্টি আরও চাই, আরও দাও বলতে বলতে এ ধরনের লোকদের জন্য লাল কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। সেই লাল কার্পেট হয়ে দাঁড়িয়েছে কোথাও রক্তের কার্পেট, কোথাও অ-সংস্কৃতি, কোথাও দ্বিচারিতা বা ধান্দাবাজি। এখন প্রমীলাবাহিনীকে পর্যন্ত লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও রাজনীতিকদের দ্বিচারিতা দেখে প্রমীলারাই রুখে উঠছেন। নিজেদের তাগিদে।

প্রাণের পাঠক আমার, আপনি পালটা যুক্তি দেবেন, ভোটার তো তাঁর মনোভাব পালটাবেনই। নইলে বদল, বদলের বদল বা তারও বদল আসবে কী করে?  সব দেশেই বদল হয়।
অবশ্যই বদল হয়। তবে সেটা নিজস্ব মনোভাবের, নিজস্ব ভাবনায় এবং নিঃশব্দে। বাংলায় যা হচ্ছে, তা রাজনীতির দাদা-দিদিদের প্রেরণায় জোরাজুরির পর্যায়ে ক্ষমতায় যেনতেনপ্রকারেণ থেকে যাওয়ার মোহে। ক্ষমতার মোহ আবার স্রেফ কিছু পাওয়ার জন্য। পদ। টাকা। চাকরি। পেট্রোল পাম্প বা মদের দোকানের লাইসেন্স। যে কারণে পার্টিকে মই বানিয়ে এ ছাদ থেকে ও ছাদে চলে যাওয়া বাড়ছে। চটজলদি কিছু পাওয়ার ভাবনা থেকে নেতা বা তাঁর ভাইয়েরা ভুলে যাচ্ছেন, এটাই শেষতম ভোট নয়।

ভুলে যাচ্ছেন এককালের হাতে মাথাকাটা পার্টি কংগ্রেস-সিপিএমের দিগভ্রান্ত বিবর্ণ দশা। আজ যাঁকে ভোট দিতে দেওয়া হল না, আজ যাঁকে রক্তাক্ত করা হল, পরের ভোটে তিনি আরও সতর্ক হয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হবেন। হবেনই। বিধানসভার ভোটে তিনি পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারলেন না, ঠিক আছে। পঞ্চায়েতে ভোট দেবেন। পঞ্চায়েতে না পারলে লোকসভা নির্বাচন রইল। ব্যালট বক্সে প্রতিবাদ থাকবেই। জীবনটা শুধু পাঁচ বছরের নয়।
আজ না হোক, কাল বা পরশু ফুলে ফুলে শেষে ভ্রমর-প্রজাপতিই উড়বে। বোমা-বাঁশ-থাপ্পড় নয়।