জাহাঁবাজ মেয়েদের জন্য পড়ে রয়েছে এক করুণ রঙিন পথ

136

জাহাঁবাজ মেয়েদের জন্য পড়ে রয়েছে এক করুণ রঙিন পথ| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaযশোধরা রায়চৌধুরী

তিনটি দশকের তিনটি বাংলা ছবি। তিনটিই আজকের ভাষায় ব্লকবাস্টার কমেডি। প্রথম, পঞ্চাশের দশকের ছবি সাড়ে চুয়াত্তর। দ্বিতীয় ছবি ষাটের দশকের গল্প হলেও সত্যি। তৃতীয় ছবি সত্তরের দশকের বসন্ত বিলাপ। এই তিন ছবিতেই দেখব মেয়েদের মুখ, মেয়েদের চিত্রায়ণের বা ইমেজের ক্রমবিবর্তন। চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন। তিন ছবির ডায়ালগে ডায়ালগে বিছিয়ে আছে বাংলার তিন দশকের মেয়েদের দেখার সমাজতত্ত্ব।

- Advertisement -

সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩) নির্মল দে-র পরিচালনায় বিজন ভট্টাচার্যের চিত্রনাট্যের। একটি পুরুষ মেসবাড়ির গল্প। সেখানে আশ্রয় নেয় এক পরিবার, স্বামী-স্ত্রী ও তাদের কলেজ যাওয়া মেয়ে। মেয়েটির ভূমিকায় সুচিত্রা সেন। কলেজ পড়ুয়া, বান্ধবীদের সঙ্গে সিনেমাতেও যায়। জড়তাহীনভাবে ফোন তুলে নেয় মেসবাড়ির। উলটোদিকে  উত্তমের, মেয়েছেলের গলা শুনছি বলে এটা  মেস-হস্টেল নয় বলে  সিদ্ধান্ত নিয়ে ছেড়ে দিন না, কী মুশকিল, ননসেন্স! বলে বিরক্তি প্রদর্শনের উত্তরে সুচিত্রা রেগে গিয়ে স্টুপিড বলে দেয়। সন্ধ্যায় পাশের ঘরে এ নিয়ে আলোচনা শুনেই সটান সে ঘরে ঢুকে উত্তমকে উলটে বলে, আপনি আমাকে ননসেন্স বলেননি?

ফলত তার সম্বন্ধে ছেলেরা বলে কী জাঁহাবাজ মেয়ে মা বলেন, মেয়ে হয়ে তোমার কী দরকার ছিল ছেলেদের কথার মধ্যে যাবার?
এরপর প্রেম ও বিবাহ আছে। পঞ্চাশ দশকের অন্য অনেক ছবিতেই সুচিত্রা সেনের এই মূর্তি। পুরুষ মেস থেকে উত্তমকে উদ্ধার করা শাপমোচন ছবিতেও। সেই দৃপ্ত ভঙ্গিমা ও মেসবাসী পুরুষদের অবাক  হওয়া।  ইন্দ্রাণী ছবিতে তার সাফল্য, স্বামীর আগে নিজে চাকরি নেওয়া। কর্মরতা মেয়েদের প্রথম প্রজন্ম পাঁচের দশকে এসেছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলা দুভাগ হবার সঙ্গে সঙ্গে রিফিউজি মেয়েদের কর্মস্থলে যাওয়া অবধারিত হয়েছে, ঘরের অবরোধ ভেঙে। যার বাস্তবোচিত ও মর্মবিদারী রূপ ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা-তে। আর মূল ধারার জনপ্রিয় ছবিগুলিতে মেয়েটিকে কিছুটা জিতিয়ে দিয়ে নায়িকা করে তোলার চেষ্টা। এরপর বেশ কিছু ছবিতে কানে এসে খট করে লেগেছে জাঁহাবাজ শব্দচয়ন। স্বাধীন ও আধুনিকা নাযিকা চরিত্রকে আশপাশের পুরুষ চরিত্ররা গ্রহণ করতে পারছে না।  টিপ্পনী হচ্ছে কী জাঁহাবাজ মেয়ে।

গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬) তপন সিংহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। গল্পকাঠামো মূলত পুরুষ প্রধান, তবে নারীদের নিয়ে টীকাটিপ্পনী ও মূল কয়েটি নারী চরিত্রের চিত্রায়ণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছায়াদেবী, ভারতীদেবীর মতো দুই নারীচরিত্র এখানে বাত্তিওয়ালা নন। ছাপোষা বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রতিভূ। সংসারী, গৃহবধূ, গৃহবন্দি এই দুই চরিত্রকে নিয়ে টিপ্পনী দিলেন বড় ভাইয়ের অফিসের বস। একটা বিরাট বড় শক্তিকে আপনারা গৃহবন্দি করে রেখেছেন মশাই।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজপোষিত ধারণা থেকে তপন সিংহ এখানে বেরিয়ে যাননি একবারের জন্যও। সমাজবীক্ষায় আপাত পুরুষপ্রধান হলেও সূক্ষ্ম টিপ্পনী এখানেও মেয়েদের নিয়ে তৃতীয় ছবি বসন্ত বিলাপ (১৯৭৩)। পরিচালক দীনেন গুপ্ত। এক লাফে বিশাল বড় কোয়ান্টাম জাম্প। এ ছবিতে কর্মজগতে প্রবিষ্ট, চাকুরিরতা  কুমারী মেয়েদের মেস বা হস্টেলের ব্যাকড্রপ। নানাভাবে সামাজিক টিকাটিপ্পনীতে এই মূলধারার ছবি গুরুত্বপূর্ণ। ছবির নাযিকাকুল নতুন প্রজন্মের, কর্মরতা মেয়ে সেইসব জাঁহাবাজ মেয়ে উঠে এসেছে একেবারে সাতের দশকে। আমি মিস ক্যালকাটা, সিগারেট ঠোঁটে প্যান্ট-শার্ট পরা বাঙালিনির চিত্র রচিত হচ্ছে। ডাঁটিয়াল মেয়েদের বারবার নানা কটুকাটব্য, রঙ্গরসিকতা করছে ছেলেরা, কিন্তু মেয়েরা এখানে ভিক্টিম হিসেবে চিত্রিত না। তারা ছেলেদের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দেয়।

নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে, প্রতিক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেয়। এই ছবিতে অপর্ণা সেন অভিনীত অনুরাধা রীতিমতো শাসানি দেয় পাড়ার বৃদ্ধদের। বাড়িওয়ালা তাকে ভাড়া দিতে বলেন। সে বলে, তার আগে নিজের উইলটা করিয়ে রাখতে ভুলবেন না। চেষ্টা করে দেখুন তুলে দিতে পারেন কি না। বাড়ির ছাত ফুটো জল পড়ে, ভাড়া চান কোন সাহসে। সরকারি চাকুরে, আত্মপ্রত্যয়ী, স্বাধীনচেতা চরিত্রের এক সমবায় এখানে বসন্ত বিলাপের বাসিন্দারা। বয়োধর্মে প্রেম করে। কিন্তু প্রেমই তাদের জীবনের একমাত্র আধার না। বিয়ে একমাত্র মোক্ষ না। স্বাধীন স্বোপার্জনক্ষম মুখগুলোই এ ছবিকে স্বাতন্ত্র‌্য দিচ্ছে। তারপর কেটে গিয়েছে গোটা পঞ্চাশ বছর। এই পঞ্চাশ বছর ধরে কত বয়ান তৈরি হয়েছে, মেয়েদের। মেয়েরা কি বাইরে বেরোলেই জাঁহাবাজ?

কাট টু দুহাজার একুশ।

দুঁদে মহিলা রাজনীতিকের গল্প। যেনতেনপ্রকারেণ তাঁকে গদি থেকে উৎখাত করার চেষ্টা চলেছে। বঙ্গের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় এই অ্যাজেন্ডা প্রায় দাঁত নখ বের করে হাজির। কিন্তু নির্বাচনি প্রক্রিয়া তো এক  সাংবিধানিক পথ। গত কয়েক মাসে যে অতি হাই ডেসিবেল, কর্ণপটাহবিদীর্ণকারী প্রচার চলেছিল, তা যেন বিধির ধার ধারেনি। অসাংবিধানিক ভাষায় প্রচার হয়েছে। নারীর অবমাননাকর ভাষায়।

টিটকিরির সুরে ডাক, ব্যক্তিগত আদরের সম্ভাষণকে পরিণত করা ভাঁড়ামিতে, এ তো শুধুই হিমশৈলের চূড়া। মূলত মেয়েদের প্রতি যে মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে তা খুবই ইঙ্গিতবহ। বাঙালির সংস্কৃতি গত শতকে যেভাবে মেয়েদের এগিয়ে দিয়েছিল, তাকে পঞ্চাশ কেন, একশো বছর পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ওপরে দেখা ৫-৬-৭ দশকের  বিবর্তিত মূল্যবোধকে খোলনলচে পালটে আবার ডাইনোসরদের যুগে নিয়ে গেল ২০২১।

যে বাংলায় চাকুরিরতা মেয়েদের আত্মনির্ভরতার গল্প তৈরি হয়েছিল, সে বাংলায় বলা হল, ঘরের মেয়েদের সময়মতো বিদায় করতে হয়। ইঙ্গিত, অবিবাহিতা রাজনীতিকের বিয়ে দিয়ে ওঁকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরানো হোক। বলা হল, ঘরে বসে রান্না করুন মেয়েরা।  সহজ সমীকরণ। মেয়ে মানেই বিয়ে দাও, রান্নাঘরে ঠেল। এতেই শেষ না। তাঁর সম্পর্কে বলা হল, শাড়ি তুলে তিনি পা দেখান, সেটা তো ভালো না…  তার চেয়ে বারমুডা পরুন।

আমাদের চমকানোর তখনও বাকি ছিল। বিগত দশকে ঘরে ঢুকিয়ে রেপ করে দেওয়া হবে মা-বোনেদের, এক প্রার্থীর এই হুমকি, মানুষ ভালোভাবে নেননি। এবারে এক প্রাক্তন রাজ্যপালের ভাষা। সদ্য ভোট বিপর্যয়ে পর, তিনি নিজেরই দলের তারকা প্রার্থীদের নগরের নটী হিসেবে বর্ণনা করলেন।  নারী অবমাননার নতুন মাইলফলক রচিত হল। কফিনের শেষ পেরেক গাঁথা হল বুঝি। তার আগেও অবশ্য মিম তৈরি হয়েছে। তারকা প্রার্থীদের মেকআপ চর্চিত ছবি আর বাম প্রার্থীদের মেকআপবিহীন মুখগুলোকে নিয়ে রসিকতা। বড় ঘরের মেয়ে বনাম কাজের মহিলা।

 চার-পাঁচ দশক আগে চাকরির অঙ্গনে আসা স্পষ্টবক্তা, সাহসী মেয়েদের ঠিক যেভাবে জাঁহাবাজ আখ্যানে অভিহিত করা হত, সেই মেয়েদের নানা তকমার খোপে আটকানো হচ্ছে। রাজনীতিতে আসা মেয়েদের টিটকিরি-নিন্দা-অপমান গালিকে শিরোভূষণ করে পুরুষ প্রধান ক্ষেত্রটিতে থাকতে হয়। যুগ যুগ ধরে চলা প্রাচীন অসম্মানের নানা ইঙ্গিতবহ আখ্যানে তাঁদের অভিহিত হতে হয়।  বিবাহপরিচয় দিয়ে তাঁকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা একদিকে, অন্যদিকে বেশ্যার অনুষঙ্গে দাগিয়ে দেওয়া। সেই পুরোনো দ্বৈততা। নারী চিত্রায়ণে এগোনোর কোনও লক্ষণ নেই আমাদের সমাজে। বরং  পিছানোর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।

(লেখক কবি ও সাহিত্যিক)