জীবনসঙ্গী বাছাইয়ে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু, ভুলুণ্ঠিত অধিকার

287

সংঘ পরিবারের মূল অভিপ্রায়, বিজেপির জন্য হিন্দু ভোট সংগঠিত করা। সুতরাং হিন্দু-মুসলিম ফাটল যত চওড়া হয়, তত তাদের লাভ। সেই লক্ষ্যেই লাভ জেহাদ ঠেকানোর আইন প্রণয়নের হিড়িক পড়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। প্রণয়নের পরেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ আইন কার্যকর করতে ইতিমধ্যে যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছে। লিখেছেন গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিভৃত যতনে সখির নামটি লিখলে শুধু হবে না এখন, জেলা শাসককে আপন মনের সেই কথা জানাতে হবে। তিনি যদি নিদান দেন যে প্রণয়টি বেআইনি, তবে বিবাহ নৈব নৈব চ। এতদিন কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কথামতো বিজেপি জানিয়েছে কী খেতে হবে, কী পরতে হবে। এখন কাকে জীবনসঙ্গিনী করা যাবে, কাকে যাবে না, সেটাও জানিয়ে দেবে ঠিক করেছে। লাভ জেহাদ ঠেকানোর নামে যে আইনটি বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ সরকার নিয়ে এসেছে এবং উত্তরাখণ্ড, কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশ সরকার আনতে চলেছে তার উপপাদ্য সেরকমই। প্রথমে লাভ জেহাদ নিয়ে অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল উত্তরপ্রদেশ সরকার। পরে আইন প্রণয়ন করে। এই আইন নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাতে আগামীদিনে বিজেপিকে যথেষ্ট বিড়ম্বনায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং আইনজ্ঞরা। এর আগেও অবশ্য একাধিক সরকারি সিদ্ধান্ত এবং বিতর্কিত আইনের জন্য বিজেপিকে বিড়ম্বিত হতে হয়েছে। একসময় নোটবন্দি করে বিজেপি ভেবেছিল, দেশে কালো টাকার কারবারিদের বিপাকে ফেলবে এবং তার ফলে দেশের অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। সেই সিদ্ধান্তে কালোবাজারের ক্ষতি হয়েছে কি না জানা নেই, তবে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে দেশের অর্থনীতি, যা এখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

- Advertisement -

কৃষকদের মঙ্গল সুনিশ্চিত করতে যে তিনটি কৃষি আইন নিয়ে এসেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, সেই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আজ দেশে কৃষক সমাজের এক বৃহত্ অংশ পথে নেমে আন্দোলন করছে। সেই আন্দোলনের উত্তরোত্তর শক্তি বেড়ে চলার মাঝে উত্তরপ্রদেশ সরকার নিয়ে এসেছে লাভ জেহাদ আইন, যা নিয়ে দেশে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, এই আইন কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের তুষ্ট করতে বিভিন্ন বিজেপি শাসিত সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োগ করতে চায়। এই আইন অসাংবিধানিক দাবি করে যবে থেকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে এক মানবাধিকার সংস্থা, তখন থেকে বিজেপি নড়েচড়ে বসেছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বিজেপিকে আইনের রাস্তায় হাঁটতে এখন বেগ পেতে হবে। লাভ জেহাদের সারাংশ হল, যদি ভিন্ন ধর্মের দুই যুবক-যুবতী বিয়ে করতে ইচ্ছুক হন এবং সেখানে প্রাক বিবাহ ধর্মান্তরণের প্রশ্ন থাকে, তাহলে সমস্ত ঘটনাটি জেলা শাসককে বিয়ের আগে নোটিশ দিয়ে জানাতে হবে। যদি জেলা শাসক তদন্ত করে বোঝেন যে, এই ধর্মান্তরণের জন্য কোনও প্রলোভন দেখানো হয়নি, উৎকোচ দেওয়া হয়নি বা ভয় দেখানো হয়নি, তাহলে তিনি সেই বিয়ে আবেদনে সম্মতি দিতে পারেন। নাহলে তিনি এই প্রণয়ঘটিত বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দিতে পারেন।

জেলা শাসকের কাছে হিন্দু তরুণীর পরিবারের কেউ অভিয়োগ নিয়ে এলেও এই বিয়েতে জেলা শাসক ঢ্যাঁড়া দিয়ে দিতে পারেন এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার অনুমতি দিতে পারেন। আর যদি নোটিশ না দেওয়া হয় এবং বিয়ের আগে মেয়েটির ধর্মান্তরণ হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ ওই যুবককে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে। অভিযুক্ত যুবক নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ না করতে পারলে তাঁর এক থেকে পাঁচ বছরের কারাবাস হতে পারে। আবার যদি দেখা যায়, কোনও নাবালিকা অথবা তপশিলি জাতি/উপজাতির কোনও নারীকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, তাহলে অভিযুক্তের শাস্তির মেয়াদ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বিজেপি যেহেতু এই আইনের মূল প্রবক্তা, অতএব ধরেই নেওয়া যায় যে, লাভ জেহাদে মূল আপত্তি মূলত মুসলিম যুবক বা তাঁদের পরিবারকে নিয়ে। লাভ জেহাদ ঠেকাতে আইন প্রণয়নের বহু আগে থেকে বিজেপি এই বিষয়টিকে তাদের দলীয় অ্যাজেন্ডার প্রথম সারিতে রেখেছিল। কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্য, ভালোবাসার নাটক করে মুসলিম যুবকরা হিন্দু কিশোরীদের প্রলুব্ধ করে, তারপর ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে। এর ফলে হিন্দু কন্যারা মুসলিম বাড়ির বধূ হয় এবং সেখানে তাদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাদের কী ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, সে সম্পর্কে যেমন বিজেপির হাতে জোরালো তথ্য নেই, তেমনই বহু হিন্দু পরিবারে বধূদের প্রভূত লাঞ্ছনা ভোগ সম্পর্কে কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মাথাব্যথা কোনওদিন দেখা যায়নি।

সংঘ পরিবারের মূল অভিপ্রায় বিজেপির জন্য হিন্দু ভোট সংগঠিত করা। সুতরাং হিন্দু-মুসলিম ফাটল যত চওড়া হয়, তত তাদের লাভ। সেই লক্ষ্যেই লাভ জেহাদ ঠেকানোর আইন প্রণয়ন। প্রণয়নের পরেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ আইন কার্যকর করতে ইতিমধ্যে যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছে। আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে মোরাদাবাদে কট্টর হিন্দু সংগঠন বজরং দলের একদল সমর্থক এক বিবাহিত দম্পতিকে আটক করে। বজরংগীদের অভিয়োগ, ২১ বছরের এক মুসলিম যুবক এক হিন্দু যুবতীকে জোর করে বিয়ে করেছে। যুবকটিকে শারীরিক লাঞ্ছনা করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ বিনা বাক্যব্যয়ে যুবককে গ্রেপ্তার করে। বিবাহিত যুবতী পুলিশের কাছে বারবার তাঁর স্বামীকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করেন। তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং এই বিয়ে তাঁদের উভয়ের সম্মতিতে হয়েছে জানানোর পরেও পুলিশ ওই যুবতীর কথায় কর্ণপাত করেনি। যুবতীকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার অভিযোগে ওই যুবক ও তাঁর ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুবতীকে সরকারি হোমে পাঠানো হয়। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগের প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে না পারায় এবং দম্পতির বক্তব্য প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের বেকসুর খালাস দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। যুবতী পরে অভিযোগ করেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং হোমে গর্ভপাতে বাধ্য করে তাঁর গর্ভস্থ ভ্রুণ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। পুলিশ এই অভিযোগ ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও এ ঘটনায় সারাদেশে বিতর্ক শুরু হয়। অবশ্য তার পরেও উত্তরপ্রদেশ পুলিশ এমন আচরণ বন্ধ করেনি।

অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারও লাভ জেহাদ আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হয়েছে। তবে এই আইনের সাংবিধানিক চরিত্র নিয়ে ইতিমধ্যে বড়সড়ো প্রশ্ন উঠেছে। আইনটি খারিজের মামলা আদালতে নথিবদ্ধ হওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এই আইনের একাধিক ধারাকে অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, এই আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের একাধিক মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। দেশের সংবিধানে পরিষ্কার বলা আছে, মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার খর্ব করা যাবে না। অথচ এই আইনে একাধিক ধারায় ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের সংস্থান রয়েছে। আদালতে নথিবদ্ধ মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, আইনটি সংবিধানের ২১ ধারার পরিপন্থী। কারণ, এতে নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইনটি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রণীত হয়েছে এবং এই আইনে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, এক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর ধর্মান্তরণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে ব্যক্তিগত অধিকারের পরিসরে গোপনীয়তার শর্তটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনে সেই শর্তকে একেবারেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি। বিয়ের আগে জেলা শাসক অথবা পদস্থ সরকারি আধিকারিকের কাছে আগাম নোটিশ দেওয়ার অর্থ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শর্ত সম্পূর্ণ লঙ্ঘিত হওয়া। এই আইনে ধর্মান্তরণ প্রশ্নেও ব্যক্তিগত অধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সমস্ত নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং বিচারপ্রার্থী হিসাবে সকলের সমান অধিকার প্রাপ্য। ১৫ এবং ১৬ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে লেখা আছে, প্রতিটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রকে পক্ষপাতশূন্য ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু লাভ জেহাদ ঠেকানোর আইনের ফলশ্রুতিতে দেশের অন্যান্য অংশের নাগরিকের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের নাগরিকরা এক সারিতে বসতে পারছেন না। কারণ, এই আইনের সাহায্যে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে নাক গলিয়ে ফেলেছে রাষ্ট্র। অন্য যেসব রাজ্যে এই আইন প্রণয়ন হবে, সেখানেও নিশ্চিত যে, একই কাণ্ড ঘটবে। এই আইন ধর্মান্তরণের প্রশ্নে রাষ্ট্র সরাসরি ব্যক্তির মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা নিজের হাতে নিল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। সাধারণত ফৌজদারি আইন মোতাবেক অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার দায় থাকে সরকারের তদন্তকারী সংস্থার ওপর। ভারতীয় আইনে যতক্ষণ না অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নিতে হয় তিনি নির্দোষ। কিন্তু এই লাভ জেহাদ আইনকে কঠোর করার অভিপ্রায়ে প্রমাণের দায় পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার ওপর রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে বরং অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি নির্দোষ। অর্থাৎ প্রথম থেকেই ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, তিনি দোষী। শুধু সংবিধান নয়, সংবিধানের অন্যতম মূল প্রণেতা আম্বেদকর এই দেশকে যে পরিচয় দিতে চেয়েছিলেন, এই আইনে তাও মুছে দেওয়া হল।

আম্বেদকর চেয়েছিলেন, এদেশে বিভিন্ন জাতি এবং ধর্মের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটুক। তিনি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে জাতিধর্মনির্বিশেষে মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলতে পারবে এবং উভয়ে মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারবে। লাভ জেহাদ আইন আম্বেদকরের সেই স্বপ্নের ভারত সাকার হতে দেবে না। এই আইন ভালোবাসার পরিবর্তে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা এবং ত্রাসের সঞ্চার করবে। এই আইন প্রণয়নের ফলে সামাজিক সুস্থিতি নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও কম নয়। অতীতে কট্টরপন্থী বজরং দলের নৃশংস হামলায় নিহত হয়েছিলেন গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেনসের মতো সমাজসংস্কারক খ্রিস্টান যাজক। দুই নাবালক পুত্র সহ তাঁকে জীবন্ত দগ্ধ করেছিল দারা সিংয়ের নেতৃত্বে বজরং দলের কট্টর সমর্থকরা। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেই বজরং দলের সঙ্গে আরও একাধিক কট্টরপন্থী দল, সংগঠন দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে সামাজিক বিন্যাসে যে বড় ধরনের টান পড়তে পারে, তাতে আর আশ্চর্য কী? ২০১৩ সালে উত্তরপ্রদেশের মজফফরপুরে লাভ জেহাদকে বিজেপি রাজনৈতিক ইস্যু করে ফেলেছিল। পরিণামে সেখানে ভয়ংকর দাঙ্গা হয়। নিহত হন ৬২ জন এবং ৫০ হাজার মুসলিম পরিবার বাস্তুচ্যূত হয়। ভালোবাসার সঙ্গে জেহাদের তিলমাত্র সম্পর্ক না থাকলেও এখন লাভ জেহাদ ঠেকানোর নামে আইন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই আইন আগামীদিনে বিজেপির হিন্দুত্বযাত্রার পথ সুগম করবে নাকি সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন আইন আনা হবে, তা জানতে আমজনতার পাশাপাশি বিজেপিও কম উদ্বিগ্ন নয়। আপাতত চুলচেরা আইনি বিতর্ক এবং শীর্ষ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ ভারতের গতিপথ।