চিনকে টেক্কা দিতে বিধানচন্দ্রের মতো  একজন বিচক্ষণকে আজ দরকার ভীষণরকম

623

মানবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনের শেষ তিন বছর অর্থাত্ ১৯৫৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৬২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে তিনি ছিলেন সাফল্যের শীর্ষে। দীর্ঘ ১৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য যেসব সমস্যাসমূহ তাঁকে ব্যস্ত রেখেছিল তা প্রায় সবই সমাধান হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিম বাংলার অর্থনীতি তখন তুঙ্গে। বেকার সমস্যা আর নেই। তাঁর সামনে কোনও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও নেই তখন। জাতীয় রাজনীতিতেও বিধানচন্দ্র রায়ের স্থান তখন অত্যন্ত সম্মানজনক। তবে পশ্চিমবঙ্গে ও জাতীয় রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া কতকগুলি ঘটনা ডাক্তার রায়কে খুবই ব্যস্ত করে তুলেছিল।

- Advertisement -

এদিকে ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পর নেহরুর ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা খুব বেড়ে যায়। ফলে মনের দিক থেকে ও নির্ভীক পরামর্শের জন্য ডাক্তার রায় ছাড়া নেহরুর কাছে আর তেমন কেউ রইলেন না। ১৯৫৯ সালের গোড়া থেকেই কেরলের প্রথম কমিউনিস্ট সরকার জনসাধারণের রোষ ও বিদ্বেষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে। কমিউনিস্টদের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ এমন জায়গায় চলে যায় যে, মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীসভার সহকর্মীবৃন্দ রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরা করতে পারছিলেন না। প্রতিদিনের বিক্ষোভ মিছিল ও ধর্মঘট-হরতালে কেরলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ভারতের হতচকিত কমিউনিস্ট পার্টি এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিল। ইন্দিরা গান্ধি তখন জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। তিনি কেরল সফর করে এসে কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি জানান। কিন্তু কেরলের রাজ্যপাল ডঃ বি রামকৃষ্ণ রাও নেহরুকে রাষ্ট্রপতির শাসন জানি না করার পরামর্শ দেন। কারণ কমিউনিস্ট সরকারের পদত্যাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। নেহরু ডাঃ রায়ের পরামর্শ চাইলেন। ডাক্তার রায়ও কেরলে রাজ্যপালের মতকেই জোরাল সমর্থন জানালেন। এর পরেই ইন্দিরা গান্ধি ত্রিবান্দ্রমে এক বিরাট জনসভায় তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসনের জন্য আবার দাবি জানালেন। ইন্দিরা ত্রিবান্দ্রম থেকে ফেরার পর নেহরু রাজ্যপাল ডঃ বি রামকৃষ্ণ রাওকে দিল্লি ডেকে পাঠালেন। জারি হল রাষ্ট্রপতির শাসন।

বিরক্ত হয়ে ডাক্তার রায় রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি অতুল্য ঘোষকে ডেকে এমন কথা বলেছিলেন, কমিউনিস্টদের বিক্ষোভ মিছিল তো আবার এ মাসেই হবে। ওদের নিজের রাজ্যে তো ওরা রাস্তায় বের হতে পারছে না। ঠিক তাই হয়েছিল, দু-তিনদিন ধরে কমিউনিস্টরা কেরলে রাষ্ট্রপতির শাসনের প্রতিবাদে কলকাতায় জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে যখন এই অবস্থা, তখন সীমান্তের খুব কাছেই চিন অধিকৃত তিব্বতে তিব্বতিদের অবিসম্বাদিত ধর্মগুরু দলাই লামার অনুগত খাম্পা সম্প্রদায়ে লোকদের সঙ্গে চিনাদের সংঘাত আরম্ভ হয়।

১৯৫০ সালে চিন তিব্বতের দখল নেওয়ার পর থেকেই ভারত ও চিনের প্রচলিত আন্তর্জাতিক সীমান্ত ম্যাকমোহন লাইন নিয়ে চিন বিতর্ক তোলে। নেহরু ১৯৫৪ সালে চিন সফরের সময় ও ১৯৫৬ সালে বান্দুং সম্মেলনে চিনের সঙ্গে পঞ্চশীলের বৌদ্ধ আদর্শ অনুযায়ী একাধিক চুক্তি করলেও চিন ম্যাকমোহন লাইনকে ভারত ও চিনের সীমানা বলে মানতে রাজি হল না। এদিকে তিব্বতিদের ধর্মবিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করা দলাই লামার সঙ্গে চিনা কমিউনিস্টদের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে আরম্ভ করল। লাসাতে দলাই লামার প্রাসাদের ও দলাই আত্মীয়-পরিজনদের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুগ যুগ ধরে খাম্পাদের ওপর ন্যস্ত ছিল। কিছু চিনা সৈন্য খাম্পাদের সরিয়ে প্রাসাদের দায়িত্ব নিতে চাইলে খাম্পারা প্রতিরোধ করে। ফলে তিব্বতে সশস্ত্র খাম্পা বিদ্রোহ দেখা দেয়। বহু চিনা সৈন্য মারা যায়। চিনা ট্যাংক-বাহিনী লাসা শহর ঘিরে ফেলে। কয়েক হাজার খাম্পা-বিদ্রোহী সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত শহর কালিম্পং পৌঁছানোর সঙ্গে বহুসংখ্যক আহত খাম্পা-বিদ্রোহীদের নিয়ে আসে। চিনা সরকার খাম্পা-বিদ্রোহীদের চিনের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়।

ভারত সরকার ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং নেহরু লোকসভায় জানান, মানবিক কারণেই খাম্পাদের কালিম্পংয়ে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং যে দেশ থেকে ভগবান বুদ্ধ তাঁর বাণী দেশে দেশে প্রচার করেছিলেন, সে দেশ কখনোই বুদ্ধ অনুগামীদের তাড়িয়ে দিতে পারে না। চিনা সরকার সরকারিভাবে কালিম্পংকে দায়ী করে চিনাবিরোধী ষড়য়ন্ত্রের অন্যতম ঘাঁটি হিসাবে। এই অবস্থায় ডাঃ রায় দার্জিলিং জেলার প্রশাসনকে শক্তিশালী করেন ও তিব্বতি শরণার্থীদের জন্য উত্তরবঙ্গের কয়েকটি স্থানে নতুন শরণার্থী শিবির স্থাপন করেন। এ সময়ে নেহরু প্রতিনিয়ত ডা. রায়ে সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। এদিকে খবর পাওয়া গেল দলাই লামা তাঁর মা, বোন, আত্মীয়-পরিজনদের নিয়ে গোপনে লাসার প্রাসাদ ত্যাগ করে ভারত সীমান্তের দিকে রওনা হয়েছেন। চিনের পাশাপাশি অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা আরোপ করা হয়। ডাক্তার রায় ওই অঞ্চলে দলাই লামার আগমন ঘটলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, তা অনুমান করে বহু অভিজ্ঞ ও পদস্থ অফিসারকে শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত দলাই লামা অসম সীমান্তের বম-ডিলা অঞ্চল দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁকে সেখান থেকে আমিনাগাঁওতে এনে ভারতীয় কর্তৃত্বে ট্রেনযোগে শিলিগুড়ি নিয়ে আসেন। শিলিগুড়িতে ট্রেন বদল করে দলাই লামা সহ তাঁর সঙ্গীদের উত্তর ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই কাজটি ডাক্তার রায় পশ্চিমবঙ্গের অফিসারদের দিয়ে নিপুণভাবে সম্পন্ন করান। নেহরু ও ডাক্তার রায় উভয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন সেদিন। কারণ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এশিয়া ভূখণ্ডের এটি ছিল এক অন্যতম রাজনৈতিক ঘটনা।

এদিকে চিনের সঙ্গে যখন ভারতের সীমান্ত সম্পর্কের ক্রমাবনতি অব্যাহত, তখন কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার কয়েকটি ছিটমহল বিশেষ করে বেরুবাড়ি ছিটমহল পাকিস্তানকে দেওয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ডাক্তার রায়ের এক সাংঘাতিক সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরের গোড়ায় জেনারেল আযুব খাঁ পাকিস্তানে ক্ষমতা দখলের কয়েকদিন আগে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খাঁ নুন দিল্লিতে আসেন। সেই সময় দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের কিছু সংখ্যক মৌজা ও ছিটমহলের বিনিময় ও হস্তান্তর নিয়ে নেহরু ও নুনের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর জেলার অন্তর্গত দহগ্রাম ছিটমহলের অধিকার পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলাকে দেওয়ার কথা। অন্যদিকে হলদিবাড়ি রেলস্টেশন সংলগ্ন বেরুবাড়ি ছিটমহল পূর্ব পাকিস্তানের রংপুর জেলাকে হস্তান্তর করার কথা। লোকসভায় নেহরু-নুন চুক্তি অনুমোদিত হয়। কিন্তু ডাক্তার রায় বেরুবাড়ির ৭০-৭৫ হাজার ভারতীয় নাগরিককে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করেন। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী নেহরু ওই চুক্তি পালন করতে ডাক্তার রায়কে চাপ দিতে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গে বেরুবাড়ি হস্তান্তর বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। ডাক্তার রায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বেরুবাড়ি হস্তান্তরের বিরুদ্ধে এক সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করান। ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্ট বেরুবাড়ির ভারতীয় ভূখণ্ড পাকিস্তানকে হস্তান্তরের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর এক ইনজাংশন জারি করে। নেহরু ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থের সঙ্গে ডাক্তার রায়ের সম্পর্কের ভয়ানক টানাপোড়েন চলতে থাকে। সে এক দীর্ঘ কাহিনী। বর্তমানে যখন চিন-ভারত বিরোধ তুঙ্গে, তখন ডাক্তার রায়ের মতো একজন বিচক্ষণকে দরকার ছিল ভীষণরকম।