স্লোগান শুনতে শুনতে নিভছে প্রদীপের আলো

51

বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি : দিনটা কোনওমতে লড়াই করে কেটে যায়। যত সমস্যা রাতের ঘুমটা নিয়ে ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার ঘেরাটোপে বন্দি রাতের ঘুম। পরিবারের রসদ জোগানোর কঠিন লড়াই। লড়াই করে ডিগ্রি অর্জন করেও এখন তা রীতিমতো স্বপ্নের কফিনে পেরেকবন্দি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলার কোর্সে ইতিহাসে এমএ পাশ করে ফুটপাথে বসে ফুল বিক্রি করেন ময়নাগুড়ির প্রদীপ। লড়াই করে টিকে থাকাই ব্রত তাঁর। ভোটের মিছিলে স্লোগান শুনে হঠাৎ করে আঁতকে ওঠেন প্রদীপ। শিক্ষান্তে কাজের গ্যারান্টি দিতে হবে। লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। এবার খেলা হবে। আরও কত কী সস্তার স্লোগান ভেসে বেড়ায়। লড়াই করে বেঁচে থাকার ডেফিনিশন প্রদীপের চাইতে বেশি আর কে জানবে। ভোটের বাজারে মিছিল আর সভায় এই ধরনের স্লোগান শুনে এখন রীতিমতো হতাশ ময়নাগুড়ির প্রদীপকুমার বাড়ই।

ভোটের বাদ্যি বাজতেই মনটা বেজায় উদাসীন প্রদীপের। জীবন এবং নিজের ঘরেই ছেয়ে থাকা একরাশ অন্ধকার যেন বিষিয়ে তুলেছে তাঁর মন। ছাত্রাবস্থায় একআধটু রাজনীতি করেননি তা নয়। তবে সেদিনের সেই স্বপ্নটা আজ অনেকটাই ম্লান এবং ফিকে হয়ে গিয়েছে।

- Advertisement -

ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি চাপগড়ের বাসিন্দা প্রদীপকুমার বাড়ই। ঐতিহাসিক জায়গা চাপগড়। চাপগড়ের দেওমালি রাস্তা দিয়ে নাকি পৌরাণিককালে পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভুটান হয়ে এসেছিলেন। সেই মাটির দেওমালি রাস্তা এখন অনেকটাই চাষের জমি। সাতসকালে ঘুম ভাঙে। শুরু হয় লড়াই। বাজারে চলে আসেন ফুল বিক্রি করতে। তারপর কয়েক খেপে প্রাইভেট টিউশন পড়ানো। এর ফাঁকেই কেবল লাইনের মেরামতির কাজ সারতে হয়। অবসর মিললে তবেই দ্বিপ্রাহরিক ভোজ। সন্ধের পর আর হাতে তেমন কোনও কাজ রাখেন না। যেন সবকিছু থেকে কিছুটা সময় দূরে থাকা।

বাড়ির বারান্দার এক কোণে প্রায় ভেঙে পড়া কাঠের চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকা। জীবনের সব চাওয়া এবং না পাওয়ার হিসেব মেলানোর অবসর। বাবা করানকুমার বাড়ই এখন আর কাজ করতে পারেন না। আর মা চিন্তারামদেবী প্রদীপকে আগেই বলেছিলেন, বাবা প্রদীপ এত পড়াশোনার দরকার নেই। আমরা গরিব মানুষ। বাবার বয়স গড়িয়েছে। কোনও একটা কাজের ব্যবস্থা করে ফেলো। সেদিন মায়ের কথায় কর্ণপাত করেননি ছেলে। না আরও কিছুটা পড়াশোনা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেই হবে জেদ ছিল মনে। ২০১২ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ করে ফেললেন। অ্যাম্বিশন থাকাটাই খুব স্বাভাবিক। ঝট করে কোনও কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারেননি সেদিন। সেই সময়ে লড়াইটা যেন ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠল। অবশেষে একেবারে ফুটপাথে বসতে হল।

ভাবনায় ছেদ পড়ল মিছিলের শব্দে। বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে একটা মিছিল আসছে। নিস্তব্ধ অন্ধকার ছেয়ে আছে পুরো বসতিটাকে। জোর স্লোগান কানে ভেসে এল- লড়াই লড়াই লড়াই চাই। লড়াই করে বাঁচতে চাই, খেলা হবে, শিক্ষান্তে বেকারের কাজের গ্যারান্টি দিতে হবে। আরও কত কী। প্রদীপ বলেন, এ কেমন লড়াই। জীবনের ছন্দে হোঁচট খেতে হচ্ছে বারংবার। মায়ের কথাটাই ঠিক ছিল। স্থানীয় বাসিন্দা প্রদীপ ঘোষাল বলেন, আমি চিনি প্রদীপকে। এমন অনেক প্রদীপের আলো নিভে যাচ্ছে। নিশ্চুপ সব সরকার।