ময়নাগুড়ি : রাসায়নিক সার ও ওষুধের পাশাপাশি এবছর কৃষকদের চড়া দামে আলুর বীজ কিনতে হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্রান্তে বীজের সাময়িক সংকটে কৃষকদের দিশেহারা অবস্থা। এতে আলু চাষে বিঘাপ্রতি খরচ বেড়ে যাচ্ছে অনেকটাই। কৃষকদের পাশাপাশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আলুর বীজের ছোটখাটো ব্যবসায়ীদেরও । সাধ্যের বাইরে যাওয়ায় আলুচাষ ছেড়ে বিকল্প চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কৃষক।

জলপাইগুড়ি জেলার কৃষকদের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল হল আলু। আমন ধান চাষের পর বলতে গেলে আলু চাষে ঝাঁপিয়ে পড়েন জেলার কৃষকরা। আর এই সুযোগে বীজ , ওযুধ বা সারের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা তোলেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী । সাময়িক সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে চড়া দাম আদায় করেন তাঁরা।

কৃষকদের অভিযোগ, বীজ বিক্রি থেকে  উৎপাদিত ফসল সব জায়গায় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কাজ করে। ওজনের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের মনমানি চলে। বস্তা প্রতি ১ কেজি , ২ কেজি এমনকি তারও বেশি বাদ দেওয়া হয়। চলতি মরশুমে কৃষকদের উৎপাদিত ধান এবং ব্যবসায়ীদের আলুর বীজের দাম লক্ষ্য করলেই ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট রাজের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। এখন অনেক ছোটো বড়ো বাজারে প্রতি মণ ধান ৩৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। যেখানে ধানের সরকারি মূল্য মণপ্রতি ৭৩৪ টাকা । অপরদিকে যে আলু কৃষকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি ৩ টাকা থেকে ৫ টাকা কিনেছিলেন সেই আলুই আজ বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষকরা প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকা কিনছে। আলু চাষের জন্য মরশুম চলছে এখন।  জমি চাষ প্রায় শেষ । আলুর বীজের সাময়িক সংকট এবং অত্যাধিক মূল্য সমস্যায় ফেলেছে কৃষকদের।  একেক ব্যবসায়ীর কাছে আলুর প্যাকেট প্রতি দামের হেরফের ৫০০ টাকা  থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত । প্রতি প্যাকেটে যেখানে আলুর নেট ওয়েট ৫০ কেজি হয় সেখানে তার থেকে কম ওজনের আলুর প্যাকেট নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা । কৃষকরা প্রতিবাদ করলে আলুর বীজের প্যাকেট ওজন করা যাবে না বলে সরাসরি জানিয়ে দিচ্ছেন আলুর ব্যবসায়ীরা । ধান , পাট , সবজি , প্রয়োজনে পালিত গবাদিপশু বিক্রি করে বা বাড়ির গয়না বন্ধক রেখে, কখনো মহাজনদের কাছে ঋণ করে সার-বীজ কিনে আলু চাষ করছেন অনেক কৃষক।

ময়নাগুড়ির চূড়াভান্ডারের কৃষক রাম রায় বলেন,  ‘গ্রামের বাজারে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে আলুর বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ব্যবসায়ীর কাছে পাওয়া গেলেও ধুপগুড়ি , ময়নাগুড়ির মতো বড়ো বাজারগুলির থেকে এরা প্যাকেট প্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন।’ ওই এলাকারই অপর কৃষক কৈলাস মণ্ডল বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটরাজ চলছে। আমাদের উৎপাদিত ফসলের দাম নেই। সেই ফসল যখন আমরা তাদের কাছে কিনতে যাই তখন অগ্নিমূল্যে কিনতে হয় । আলুর যে  প্যাকেট আমরা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বিক্রি করেছি সেই একই প্যাকেট আজ আমাদের চড়া দরে কিনতে হচ্ছে। আমরা বিক্রির সময় মেপে নিত এবং প্যাকেট প্রতি ১/২ কেজি আলু বেশি দিতে হতো। এখন আমরা যখন বীজের আলু কিনতে গেলে বলা হচ্ছে, মেপে নেওয়া চলবে না। র্দিষ্ট মাপের থেকে ৫  কেজি পর্যন্ত কম নিতে হচ্ছে।’ ধূপগুড়ি ব্লকের কৃষক মদন সরকার বলেন , ‘বীজ থেকে শুরু করে সার, ওষুধের যে দাম সেই হিসাবে এবার আলু করতে গেলে বিঘাপ্রতি পাঁচ হাজারের উপরে বেশি খরচ হচ্ছে। তাই যতটা পরিমাণ আলু লাগানোর প্রথা তা লাগাতে পারছি না। অন্য ফসল চাষ করার পরিকল্পনা করছি।’

হুসলুরডাঙ্গা বাজারের ক্ষুদ্র আলু ব্যবসায়ী বিমল ভৌমিক বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবছর আলুর বীজের দাম অনেক বেশি। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের  সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’

ধুপগুড়ির আলু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আশিস দাস বলেন, ‘কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট বলে কিছু ঘটছে না। মূলত খাবার আলুর দাম অনেকটা বেশি। এছাড়া এবছর পাঞ্জাবে আলুর বীজ কম ছিল। চাষিরাও বেশি পরিমাণে আলু লাগাচ্ছেন। তাই চাহিদার তুলনায় আলুর বীজ কম থাকায় দাম একটু বেশি। ধূপগুড়িতে বর্তমান যে পরিমাণ আলুর বীজ আছে তাতে সপ্তাহখানেক বিক্রি চলবে। তারপর আবার আমদানি করতে হবে।’

ময়নাগুড়ি ব্লক কৃষি আধিকারিক কৃষ্ণা রায় বলেন, ‘কৃষকদের তরফ থেকে এরকম কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। তাদের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তাঁরা অফিসে জানাবেন।’

তথ্য ও ছবি – জগন্নাথ রায়