গ্রামীণ অর্থনীতিতে দিশা দেখাচ্ছে সোনালি মুরগি

সাজাহান আলি, পতিরাম: গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে দক্ষিণ দিনাজপুর কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রে শুরু হয়েছে নতুন প্রজাতির সোনালি মুরগি পালন। তিন মাস আগে বাংলাদেশ থেকে আসা এই মুরগি মাঝিয়ান ক্যাম্পাসের মধ্যে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পালন করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ। সোনালি মুরগি সাধারণত খাঁচার বাইরে ছেড়ে পালন করা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট একটা জায়গার মধ্যেই এরা সীমাবদ্ধ থাকে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ইনটেনসিভ পদ্ধতি। দেশি মুরগির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ডিম দেয় এই সোনালি মুরগি। ফলে সাধারণ মুরগির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই মুরগি পালনের ক্ষেত্রে। মুরগি পালনের পাশাপাশি মেশিনের সাহায্যে এই সোনালি মুরগির ডিম থেকে প্রচুর পরিমাণে বাচ্চা তৈরি করা সম্ভব। গ্রামীণ মহিলা সহ সাধারণ মানুষ যাতে এই সোনালি মুরগি পালন করে লাভবান হতে পারেন, সেইজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
দক্ষিণ দিনাজপুর কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রাণীবিজ্ঞানী অরূপ সিং জানালেন, বাংলাদেশ থেকে আগত সোনালি জাতের মুরগি পালন বর্তমান সময়ে বেশ লাভজনক। দেশীয় যে সমস্ত মুরগি পালন গ্রামাঞ্চলে করা হয, তার তুলনায় সোনালি মুরগি পালনে সমস্তদিক দিয়ে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়। এই ধরনের মুরগি পালনের জন্য একটা ঘেরা জায়গা বা খামার থাকলে খুব ভালো হয়। মুরগিগুলোকে রাখার জন্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে একটা বড় ধরনের খাঁচা তৈরি করা প্রয়োজন। এই আবাসের চারপাশে হাওয় বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর শীতকালে যাতে ঠান্ডা হাওয়া বেশি পরিমাণে খাঁচায় ঢুকতে না পারে, তার জন্য পলিথিনের পর্দা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি মুরগির খাচার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থাও থাকা দরকার। এতে করে প্রয়োজনে তাপমাত্রা বাড়িয়ে শীতের হাত থেকে মুরগিকে রক্ষা করা যায়। মুরগি খাঁচায় রাখার জন্য কাঠের গুঁড়ো, তুষ ইত্যাদি দিয়ে মুরগির বিছানা তৈরি করতে হয। মুরগির এই বিছানাকে বিজ্ঞানের ভাষায় লিটার বলে। সাধারণত ১৫ দিন পরপর মুরগির বিছানার পরিবর্তন করলে মুরগির পক্ষে ভালো হয়। নোংরা পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কোনও কারণে মুরগির এই বিছানা জলে ভিজে গেলে তাতে কলিচুন প্রয়োগ করতে হয, যাতে করে ক্ষতিকারক অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হতে না পারে। কারণ এই ক্ষতিকারক গ্যাসের কারণে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয। মুরগিগুলোকে খামারের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে পালন করতে হয়। সারাদিন খামারের বা বাইরের বিভিন্ন খাবার খেয়ে সন্ধ্যাবেলায় আবার নিজেদের আশ্রয়ে ফিরে আসে ।
স্বরূপ সিং আরও জানান, খামারের বাইরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে যে সমস্ত খাবার খায় তার পাশাপাশি এদের সুষম খাদ্য দেওয়াও প্রয়োজন। মুরগির বয়স, আকার ইত্যাদি অনুযায়ী এই খাবারের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। মূলত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, শর্করা, ফ্যাট ইত্যাদি খাবার দিলে তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এছাড়া ২০ থেকে ৩০টি মুরগিপিছু একটি করে জলের পাত্র থাকা প্রয়োজন। সাধারণ খাবারের পাশাপাশি যে সমস্ত সুষম খাবার মুরগির জন্য প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে ধানের গুঁড়া, গমের ভুসি, গমভাঙা, ক্যালসিয়াম হিসেবে ছোটমাছের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়ো এবং বাজার থেকে পাওয়া সহজ খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ খাবার। প্রয়োজন মতো সুষম খাদ্য দিলে মুরগির বৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। সাধারণত যেসব দেশি মুরগি গ্রামাঞ্চলে পালন করা হয, তারা সারা বছরে সর্বাধিক ১০০ থেকে ১২০টি ডিম দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা এই সোনালিজাতের মুরগি পাঁচ মাস বয়সের পর থেকেই ডিম দিতে শুরু করে। এরা বছরে কমপক্ষে ১৮০ থেকে ২০০টি ডিম দেয়। একটি সোনালি মুরগি সারা বছরে প্রায় একহাজার টাকার মতো ডিম দিতে পারে। ডিম উৎপাদনের পাশাপাশি এই ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে ইনকিউবেটর বা ডিম ফোটানোর মেশিনের মাধ্যমে। প্রচুর পরিমাণে সোনালি জাতের মুরগির বাচ্চা তৈরি করার প্রাথমিক প্রক্রিয় চলছে।
দক্ষিণ দিনাজপুর কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান ও বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, এই জেলায় সোনালি জাতের মুরগি পালনের বিষয়টি নতুন ভাবে শুরু হয়েছে। আগে এই ধরনের মুরগি পালন এই জেলায় তেমন দেখা যায়নি। আমরা চাইছি অত্যন্ত লাভজনক সোনালি জাতের মুরগি পালন যাতে জেলার মানুষেরা শুরু করেন। এতে নিজেদের গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। মুরগি পালনের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।