ম্লান হচ্ছে পৌষ পার্বণ, শোনা যায় না ঢেঁকির আওয়াজ

227

গৌতম সরকার, মেখলিগঞ্জ: ক্রমশই ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৌষ পার্বণ। মকর সংক্রান্তিকে ঘিরে আর তেমন উৎসাহ চোখে পড়ে না বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মেখলিগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন গ্রামগুলিতে। বর্তমানে পৌষ পার্বণের পিঠে তৈরির বিভিন্ন উপকরণেও ছাম গাইন বা ঢেঁকির আওয়াজের দেখা পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কয়েকবছর আগেও পৌষ পার্বণের কয়েকদিন আগেই সীমান্তের এই গ্রামগুলি থেকে সকাল থেকেই কানে আসত ঢেকির চাল গুঁড়ো করার শব্দ। কিন্তু সেই সব আজ অতীত।

কয়েকজন আবার জানিয়েছেন, একটা সময় যখন সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া ছিল না সেই সময় পৌষ পার্বণের আগে পিঠে তৈরির বিভিন্ন উপকরণ যেমন নারকেল, খেজুরের গুড় নিয়ে আসা হত বাংলাদেশ থেকেও। আত্মীয় পরিজনদের মাধ্যমে যথাসময়ে ওইসব জিনিস এপারে চলে আসত। তারপর সেগুলি দিয়ে পোষ পার্বণের রাত থেকেই পিঠে তৈরির কাজ শুরু হত। তবে, এখন পৌষ পার্বণ হয় তবে শুধু নিয়ম পালনের জন্য।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার পৌষ পার্বণের পিঠে তৈরির জন্য ঢেঁকি দিয়ে চাল গুঁড়ো করতে চোখে পড়ল মেখলিগঞ্জ ব্লকের ৭২ নিজতরফ গ্রামের অনেককেই। ঝর্ণা সরকার, ভক্তি সরকার, মিনতি রায়, পরিরানি রায়, পদ্মা রায়, কবিতা সরকার, আন্না রায় প্রমুখ জানান, সীমান্তের এই এলাকাতেও আগের মতো পৌষ পার্বণের উৎসাহ আর নেই। পূর্বপুরুষদের কাছে তাঁরা জানতে পেরেছেন একটা সময় এই উপলক্ষ্যে কয়েকদিন আগে থেকেই এলাকায় পৌষ পার্বণ উৎসবের ধুম পড়ে যেত। এখন সেটা অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। পিঠের আমন্ত্রণে সারা দিতে ওপার বাংলা থেকেও এখন আত্মীয় পরিজনদের আগমন হয় না। মূলত ঢেঁকির মাধ্যমে চাল গুড়ো করেই পিঠে বানানোর প্রচলন রয়েছে গ্রাম বাংলায়। সারাবছর না হলেও পৌষ পার্বণের আগে সকলেই ঢেঁকি ঠিক করে রাখতেন। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকি ছিল। কেউ কেউ সারা বছর এই ঢেঁকি ব্যবহার করতেন। বর্তমানে সারাবছরতো দূরে থাক বছরে একদিনও ঢেঁকি ব্যবহার করেন না গ্রামাঞ্চলেরও বহু মানুষ।

এদিন মেখলিগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে ঢেঁকি দেখা যায়। সীমান্তের চ্যাংরাবান্ধা গ্রামের রেখা মণ্ডল, বাসনা মজুমদাররা জানান, আগে পৌষ পার্বণের প্রস্তুতি শুরু হত দু-তিনদিন আগে থেকেই। প্রতিবেশী কয়েকটি বাড়ির মহিলারাও একত্রিতভাবে চাল গুঁড়োর কাজ করতেন। তারপর মিলেমিশে পিঠে তৈরি করে ভাগাভাগি করে নিতেন। একসঙ্গে মিলেমিশে পৌষ পার্বণের পিঠে তৈরির কাজের আনন্দটাই নাকি আলাদা ছিল। এখন সেসব হয়না। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের এই কাজে আগ্রহ কমেছে। তাছাড়াও অনেকেই বাড়িতে মিক্সচার মেশিনের সাহায্যে চাল গুঁড়ো করে পিঠে তৈরি করছেন। কেউ বা আবার বাজার থেকে চালের গুঁড়ো এমনকি বাইরে থেকে রেডিমেড পিঠেও কিনে আনেন। বাড়িতে এইনিয়ে পরিশ্রমও করতে চাননা অনেকেই। যেসব বাড়িতে এখনও এইনিয়ে একটু সাজোসাজো রব চোখে পড়ে সেইগুলি বয়স্কদের জন্যই হচ্ছে বলেও এলাকাবাসী জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে সীমান্তের গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে পৌষ পার্বণের আনন্দ। শোনা যায়না ঢেঁকি, ছাম গাইনের শব্দও।