দারিদ্র্য বাধা হলেও শিক্ষায় আগ্রহ কমেনি

রহিত বসু : আজ আপনাদের কয়েকজন কন্যার কথা শোনাই। এদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের অনেক বিষয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তার মধ্যে একটা মিল হল, এরা সকলেই মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে এবং রেজাল্ট না বেরোলেও এগারো ক্লাসের পড়াশোনা শুরু করেছে। তবে পড়াশোনা শুরু করেছে কথাটা বলা যতটা সহজ, কাজে ততটা নয়। তার একটাই কারণ এবং তা হল দারিদ্র‌্য।

যেমন ধরা যাক, বান্টি বর্মনের কথা। লাটাগুড়ির স্টেশনপাড়ায় বাড়ি। আর্থসামাজিক অবস্থার বিচারে পিছিয়ে পড়া এলাকা। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলও আলোকিত নয়। বাবা বেতশিল্পী। সাতজনের পরিবারে একমাত্র রোজগেরে সদস্য। বান্টি কেন পড়াশোনা করছে? সহজ উত্তর হল, স্বাবলম্বী হয়ে সমাজ ও পরিবারের জন্য কিছু করে ফেলা। কিন্তু লক্ষ্য স্থির করা যত সহজ, লক্ষ্য পূরণ করা কি ততটা সহজ হয় সবসময়? হয় না। বান্টির ক্ষেত্রেও হচ্ছে না। এতদিনে টেনেটুনে চললেও এখন বেশ অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু উপায় আছে কি কিছু? সকলে তো ভাবেন, এত সমস্যা কোথায়? সরকার তো উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা ফ্রি করে দিয়েছে। যাঁরা এমন বলেন, তাঁদের আরও একটু খোঁজখবর নেওয়া উচিত।

- Advertisement -

এখনকার প্রথা হল, পড়ুয়া যে পরিবারেরই হোক না কেন, যেমন পরিবেশেই বড় হয়ে উঠুক না কেন, তার শুধু টেক্সট বই পড়লেই চলবে না, রেফারেন্স বইও কিনতে হবে। অনেক সময় স্কুল বা শিক্ষক এমন করতে বাধ্য করেন। আর আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম, এগারো ক্লাসের আর্টসের রেফারেন্স বই কিনতে হলে ২৫০০-৩০০০ টাকা প্রয়োজন। আরেক কন্যা মেঘা দত্তর বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন। বাড়িতে মা এবং ছোট বোন। অনেক কষ্টে মা দুমেয়েকে মানুষ করেছেন। সংসার চালান কাকা। তাঁর একটি মুদির দোকান রয়েছে। মেঘা ঠিক করে ফেলেছে, সে বিউটিশিয়ান হবে। কিন্তু তার আগে পড়াশোনা শেষ করতে হলে তাকে অনেক বাধা টপকাতে হবে।

সুনন্দা রায়ের অবস্থা কিছুটা জটিল। এমনিতে সে যে এলাকায় থাকে সেখানকার আর্থসামাজিক পরিবেশ যথেষ্ট উন্নত। বাবা সাফারি গাড়ির গাইড। কিন্তু লকডাউনের জন্য গত তিন মাস জঙ্গল সাফারি বন্ধ। এর উপর বর্ষার জন্য তিন মাস জঙ্গল বন্ধ থাকবে। তাহলে সংসারই বা কী করে চলবে আর পড়াশোনার খরচই বা জোগাড় হবে কী করে? কিন্তু স্বপ্নে কি আর লাগাম পরানো যায়! এত বাধা সত্ত্বেও মেঘার আগ্রহ শিল্পকলায় এবং ওই বিষয় নিয়ে সে পড়াশোনা করতে চায়। একই স্বপ্ন কুমলাই গ্রাম পঞ্চায়েতের কান্তদিঘি কুমারপাড়ার বীথিকা লালার। আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বিচারে পিছিয়ে পড়া এলাকা। বাবা শিলিগুড়ির বেকারিতে কাজ করেন। বীথিকা শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হতে চায়।

এবার বলুন তো নমিতা বালা এবং প্রিয়া বালার মধ্যে মিল কোথায়? এই দুই কন্যাই শিক্ষক হতে চায়। কিন্তু হতে চাইলেই হওয়া সম্ভব? তার আগে অনেক সিঁড়ি পেরোতে হবে এবং সব সিঁড়িতেই বাধা। যেমন, নমিতার বাবা অসুস্থ হওয়ায় তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। মা একটি স্কুলে সহায়িকার কাজ করেন। নমিতা অনেক পড়াশোনা করতে চায় এবং তারপর শিক্ষিকা হতে চায়। প্রিয়ার বাবার যেমন বছরভর কাজ থাকে না। কী করে যে সংসার চলে, ঈশ্বর জানেন। ফলে দারিদ্র‌্য তাঁদের স্বাভাবিক সঙ্গী। এর মধ্যেই প্রিয়ার পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে হচ্ছে। অনুপমা রায়ের পরিবারেরও জমিজমা সামান্য। চাষবাস করে মোটামুটি খাওয়া-পরা চলে যায়। এখন গরিবের সংসারে অগ্রাধিকার কীভাবে ঠিক হয়, তা কি সবাই জানেন? অতএব, এই পরিবারেও দারিদ্র‌্যের সমস্যা।

কিন্তু আমি অবাক হয়েছি অন্য কারণে। এরা কেউই বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষার কথা বলছে না, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-টেকনোলজিস্ট হওয়ার কথা বলছে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় আগ্রহের কথা বলছে না অথবা অন্য কোনও স্কিল অর্জনের আগ্রহ আছে কি না, তাও জানা যায় না। এখন দারিদ্র‌্যের জন্য তাদের এই সব ইচ্ছা যদি চাপা পড়ে থাকে, সে অন্য কথা। তবে কেউ যদি বলেন, দারিদ্র‌্য প্রতিভার বিকাশের পথে বড় বাধা, সে কথা মেনে নেওয়া যায় না। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিতে স্নাতকদের ৪০ শতাংশ মহিলা। যদিও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ছবিটা একরকম নয়। সেখানে মোট বিজ্ঞানী-ইঞ্জিনিয়ার-প্রযুক্তিবিদের ১৪ শতাংশ মাত্র মহিলা।

সেখানে আর মহিলাদের অর্ধেক আকাশ বলা যাচ্ছে না। অথচ আর্জেন্টিনায় ৫৩ শতাংশ, নিউজিল্যান্ডে ৫২ শতাংশ। রাষ্ট্রসংঘই বলছে, ভারতে বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, গবেষণা সংক্রান্ত চাকরিতে বাড়েনি। কেন বাড়েনি? এ ব্যাপারে যে কারণ সামনে আসছে ইংরেজিতে তাকে বলা হয় জেন্ডার পে গ্যাপ। পরিসংখ্যান বলছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও গণিতে গবেষণার ক্ষেত্রে মহিলা গবেষকরা তুলনায় কম বেতন বা ভাতা পান। ফলে তাঁদের কেরিয়ারের অগ্রগতি হচ্ছে না। রাষ্ট্রসংঘের ব্যাখ্যা হল, মহিলাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় তাঁরা যথেষ্ট স্মার্ট নন।

ভগবান জানেন, কাদের মাথা থেকে এই সব জিনিস বেরিয়েছে!