বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে এলেন

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত : সশব্দে ব্রেক কষল গাড়ি, লাফিয়ে রাস্তায় নামলেন প্রণব, ছুটে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। ছুটে এলেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি ভেনু রাজামণি। ছুটে এলেন রাষ্ট্রপতির মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মুহূর্তে সারা রাস্তা কর্ডন করে ফেলল রাষ্ট্রপতির স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স। কিন্তু তখন রাষ্ট্রপতির সেইদিকে হুঁশ নেই। তিনি তখন গাড়ি থেকে নেমে সোজা হেঁটে যেতে চাইছেন খাদের দিকে। শশব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আপনি গাড়ি থেকে কেন নেমে পড়েছেন দাদা? শিগগির গাড়িতে উঠুন! একই আর্জি এল রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি, আর্মির নিরাপত্তা উপদেষ্টা, আর্মির মেডিকেল অফিসারের কাছ থেকেও। মেজাজ হারালেন রাষ্ট্রপতি। ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন, কী বলছ তোমরা? এত বড় অ্যাক্সিডেন্ট! এতগুলো মানুষ খাদে পড়ে আছে। আর আমি মুখ ঘুরিয়ে চলে যাব? এবার রাস্তায় নামলেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। ইস তরহ সে আপকা রাস্তে পে উতরনা খতরে সে খালি নহী হ্যায়…আন্দার আ জাইয়ে মুখার্জি সাব। ত্রিপাঠীজির কথা যেন শুনেও শোনেননি রাষ্ট্রপতি। বুলেটপ্রুফ গাড়ির বাইরে সেদিন বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। অনেক সাধ্যসাধনা করে সেদিন তাঁকে কার্সিয়াংয়ের রেস্ট রুমে পাঠাতে পেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে চারদিনের সফরে দার্জিলিং আসেন প্রণববাবু। সেই সফরে সঙ্গী হয়েছিলাম আমিও। দিল্লি থেকে বায়ুসেনার বিশেষ বিমানে বাগডোগরা, সেখান থেকে গাড়ি করে দার্জিলিং পৌঁছেছিল রাষ্ট্রপতির কনভয়। দার্জিলিং ম্যালে কিংবদন্তি নেপালি কবি ভানুভক্তের জন্মতিথি উদ্‌যাপন ও রাষ্ট্রপতিকে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গোটা রাজ্যের নজর তখন পাহাড়ে। সময়টিও ছিল যথেষ্ট স্পর্শকাতর। একদিকে বিমল গুরুংয়ের মোর্চার নেতৃত্বে পাহাড় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল একটু একটু করে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে, অন্যদিকে পাহাড়ের রাশ হাতে পেতে মরিয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চারদিকে চাপা উত্তেজনা। তারমধ্যেও বসে থাকেননি রাষ্ট্রপতি। কখনও চলে গিয়েছেন মহাকাল মন্দিরে, কখনও তেনজিং নোরগে মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। কখনও হেঁটে বেরিয়েছেন ম্যালে, কখনও দেখা করেছেন পাহাড়ের জনপ্রতিনিধি ও মোর্চার লোকজনদের সঙ্গে।

- Advertisement -

রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনার মঞ্চে ডাক পাননি তৎকালীন জিটিএ চিফ ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সুপ্রিমো বিমল গুরুং। রাজ্যের তরফে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি। পরে অবশ্য নেপালি কবি ভানুভক্তের জন্মদিবস পালন ও ম্যালে তাঁর মূর্তি উন্মোচনে ডাক পান গুরুং। কিন্তু রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনার মঞ্চে হাজির থাকতে না পারার ক্ষোভ ভোলেননি তিনি। সুযোগ খুঁজছিলেন কীভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে দুটো কথা শোনানো যায়। পাহাড়ে তখন মমতা-গুরুং অহিনকুল সম্পর্ক। সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। দার্জিলিং প্রাচীন টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভায় রাষ্ট্রপতির সামনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন গুরুং। সচরাচর দেশের প্রথম নাগরিকের উপস্থিতিতে এভাবে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আক্রমণ শানানো সাংবিধানিক নীতিবিরুদ্ধ। সেইদিন তাই করেছিলেন গুরুং। অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন প্রণববাবু। পরে বক্তৃতার সময় গুরুংকে মিষ্টি কথায় দুরমুশ করেছিলেন। ঠান্ডা অথচ কঠিন গলায় জানিয়েছিলেন, শুধু বিরুদ্ধাচরণ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা করে মহৎ কাজ করা যায় না। রাষ্ট্রহিতে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়। সেদিন ঘুরিয়ে গুরুংকে রাজধর্ম পালনের পাঠ পড়িয়েছিলেন প্রণববাবু। সেই অসাধারণ বাগ্মিতা, ক্ষুরধার যুক্তি ও সর্বোপরি ভারতের জাতীয় গ্রন্থ সংবিধানের উপর তাঁর অসামান্য দখল আজও ভুলিনি।

চারদিনের সফরে সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তটি ছিল শেষদিন। দার্জিলিং রাজভবনের সামনে থেকে রাষ্ট্রপতির বিশেষ কনভয়ে ৩৩টি গাড়ির কারকেড যাত্রা শুরু করে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। ঝকঝকে রোদ মেখে পাহাড় তখন সত্যিই হাসছিল। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফিরে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী সহ রাজ্য মন্ত্রীসভার বহু বিশিষ্ট সদস্য। দার্জিলিং ছাড়িয়ে ঘুমে নেমে আসতেই শুরু হল বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি যে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় জিরো ভিসিবিলিটি। গাঢ় কুয়াশায় দেখা যাচ্ছে না কিছুই। সবার আগে পাইলট কার। তার পিছনে রাষ্ট্রপতির বুলেটপ্রুফ লিমুজিন। তার পিছনে সারি দিয়ে গাড়ি। বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি রাস্তায় প্রত্যেকটি গাড়ি ৮০-৯০ কিমি প্রতি ঘণ্টায় দৌড়াচ্ছে। ঘুম পেরিয়ে সোনাদার কাছাকাছি আসতেই ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনা।

চোখের সামনে দেখলাম কুয়াশাঘেরা পাহাড়ি বাঁকে বাফার ভেঙে গভীর খাদে নেমে গেল কারকেডের ছনম্বর গাড়ি। রাষ্ট্রপতি সিকিউরিটি ফোর্সের পাঁচজন ও ড্রাইভারকে নিয়ে গাড়ি হারিয়ে যায় খাদের অতলে। থমকে গেল কারকেড। সবাই খাদের রেলিংয়ের ধারে ছুটে এল। জানতে পেরে গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলেন রাষ্ট্রপতি। খাদের গভীরে তলিয়ে যাওয়া সেই ৬ জনের জন্য তাঁর উদ্বেগ দেখেছিলাম সেদিন। যতক্ষণ না দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ির সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ততক্ষণ তিনি শিলিগুড়ি চলে যাননি। সৌভাগ্যবশত সেদিন প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় সেই খাদ থেকে উদ্ধার করা গিয়েছিল সবাইকেই। মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে তাঁদের ভর্তি করা হয় স্থানীয় হাসপাতালে। প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন তাঁরা। তাঁদের কুশলতার খবর নিয়ে তবেই বাগডোগরা থেকে দিল্লির উদ্দেশ্য রওনা হয়েছিলেন প্রণব।

সেই প্রথম দেশের কোনও রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় নিযুক্ত সুরক্ষাকর্মীদের জন্য নিজের নিরাপত্তার পরোয়া না করে সোজা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেই তা বোধহয় সম্ভব হয়েছিল।