ভুট্টার দাম তলানিতে, বিপাকে কোচবিহারের চাষিরা

863

তুষার দেব, দেওয়ানহাট : ভুট্টা কোচবিহার জেলার অন্যতম অর্থকরী ফসল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের জেরে বর্তমানে জেলায় ভুট্টার দাম তলানিতে এসে ঠেকেছে। এতে বিপুল সংখ্যক চাষি ভুট্টার অভাবী বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন। দাম বাড়বে- এই আশায় ঘরে জমিয়ে রাখা ভুট্টাও ইতিমধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে ভুট্টাচাষিরা বেজায় বিপাকে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী রবি মরশুমে জেলায় ভুট্টা চাষের এলাকা একধাক্কায় অনেকটা কমে যেতে পারে বলে কৃষি দপ্তরের আশঙ্কা। কোচবিহারের কৃষক মহল দীর্ঘদিন যাবৎ জেলায় ভুট্টাকেন্দ্রিক শিল্পস্থাপনের দাবি জানালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ। অবিলম্বে এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের তরফে ইতিবাচক পদক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন তারা। উল্লেখ্য জেলা কৃষি দপ্তর, উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ফার্মার্স ক্লাবের সম্মিলিত প্রয়াসে গত কয়েক বছর ধরে কোচবিহার জেলায় ভুট্টা চাষে বিপ্লব এসেছে। অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় প্রচুর কৃষক ভুট্টা চাষে ঝুঁকেছেন। ২০১৯-২০ রবি মরশুমে জেলায় ২২ হাজার ৯৫২ হেক্টর জমিতে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। অন্যান্য বছর কোচবিহারে উৎপাদিত ভুট্টার সিংহভাগ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও বেশ কিছু রাজ্যে চালান করা হয়। ফলত ভুট্টাচাষিরা আশানুরূপ দাম পেয়ে থাকেন। কিন্তু এ বছর মার্চ মাসে লকডাউন শুরু হওয়ায় ভুট্টার চালান প্রায় হয়নি বললেই চলে। ফলে জেলায় ভুট্টার পাইকারি দাম একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে গুণমান অনুসারে ভুট্টার দাম কুইন্টাল প্রতি সাড়ে আটশো টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা। অন্যান্য বছর এ সময় ভুট্টার ন্যূনতম দাম থাকে কুইন্টাল প্রতি দেড় হাজার টাকা। করোনো পরিস্থিতি জারি থাকায় এ বছর ভুট্টার দাম বাড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

জিরানপুর সবুজ সাথী ফার্মার্স ক্লাবের সদস্য তথা চাতরাচেকাডরা এলাকার কৃষক সুদর্শন দাস বলেন, রবি মরশুমে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলাম। বর্তমানে ভুট্টার দাম অত্যন্ত কম। কিন্তু আমন চাষের খরচ জোগাতে কম দামেই কিছু ভুট্টা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। বাকি ভুট্টা ঘরে থেকে নষ্ট হতে শুরু করেছে। বলরামপুরের সর্পসিংরা এলাকার শুভঙ্কর দাস প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, ভেবেছিলাম ভালো দামে ভুট্টা বিক্রি করে টাকা পরবর্তী চাষের কাজে লাগাব। কিন্তু এখন ভুট্টার যা দাম রয়েছে তাতে উৎপাদন খরচ উঠবে না। এই ক্ষতি সামলে ওঠা অত্যন্ত কঠিন।

- Advertisement -

কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কর্মরত সাতমাইল সতীশ ক্লাব ও পাঠাগারের সম্পাদক অমল রায় বলেন, আমাদের তত্ত্বাবধানে প্রায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ভুট্টা বিক্রি অলাভজনক। ভুট্টাচাষিদের সুবিধার জন্য আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ জেলায় ভুট্টাকেন্দ্রিক শিল্পস্থাপনের দাবি জানিয়ে এলেও তা বাস্তবতা পায়নি। অতি শীঘ্র প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ করুক। কোচবিহার জেলা উপ কৃষি অধিকর্তা অরুণকুমার বসু বলেন, গত কয়ে বছর যাবত্ লাগাতার প্রয়াস চালিয়ে জেলায় ভুট্টা চাষের এলাকা বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ভুট্টার দাম  কম থাকায় চাষিরা আগামী রবি মরশুমে ভুট্টা চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে জেলায় ভুট্টা চাষের এলাকা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এ বিষয়ে বলেন, কোচবিহার জেলায় ভুট্টাকেন্দ্রিক শিল্পের অন্তত পাঁচটি ইউনিট স্থাপন প্রয়োজন। বর্তমানে তুফানগঞ্জ মহকুমার দেওচড়াই মোড়ের কাছে একটি ইউনিটের কাজ চলছে। বাকি দুটি ইউনিট স্থাপনের বিষয়ে কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জেরে তা স্থগিত হয়ে যায়। কোচবিহার তথা গোটা রাজ্যের কৃষকদের সুবিধার্থে রাজ্য সরকার দায়িত্বশীল।