আলু বিকোচ্ছে ৩ টাকা কিলোয়, বিপন্ন উত্তরবঙ্গের চাষিরা

516

উত্তরবঙ্গ ব্যুরো : গত মরশুমে আলুর দাম ছিল আকাশছোঁয়া। আশা ছিল, এবারও দাম একই থাকবে। কিন্তু সেই আশা যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা স্বপ্নেও ভাবেননি তাপস, যোগেন, আব্দুল, জগদীশরা। এ বছর আলুর দাম তলানিতে ঠেকেছে। তাতে মাথায় হাত লক্ষ লক্ষ আলুচাষির। গত মরশুমে খুচরো বাজারে আলুর দাম ছিল ৪০-৪৫ টাকা প্রতি কেজি। অনেক জায়গায় ৫০ টাকা প্রতি কেজি দরেও আলু বিক্রি হয়েছে। দাম বেশি পাওয়ায় অধিক লাভের আশায় চলতি বছরে আলুর আবাদ বেড়েছিল। গতবার জলপাইগুড়ি জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার হেক্টর। এবার আলু চাষের জমির আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর। কোচবিহার জেলার  মেখলিগঞ্জ ব্লকে এবার আলু চাষ হয়েছে ২,৩৫০ হেক্টর জমিতে যা আগের বারের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু চাষিদের এখন বিধি বাম অবস্থা। ৪০ বা ৫০ তো দূরের কথা, কোচবিহারে পাইকারি বাজারে আলুর দাম নেমে এসেছে কেজি প্রতি পাঁচ-সাড়ে পাঁচ টাকায়। জলপাইগুড়ির অবস্থা আরও শোচনীয়। সেখানে তিন টাকাতেও আলু বিক্রি হয়েছে।

গতবার বেশি লাভ হওয়ায় বীজ, রাসায়নিক সারের চড়া দাম সত্ত্বেও চাষিরা জমিতে পোখরাজ, জ্যোতির মতো প্রজাতির আলু চাষ করেছেন। এতে প্রতি কেজিতে চাষিদের খরচ হয়েছে ১০-১১ টাকা। কিন্তু যেভাবে আলুর দাম কমে গিয়েছে, তাতে লাভ পরের কথা, চাষের খরচটুকু উঠবে কি না, চাষিদের কাছে সেটাই এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন। অন্য সমস্যা ফসল নিয়ে। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার আলুর ফলন বেশ ভালো। সেটাই কাল হল চাষিদের। পর্যাপ্ত হিমঘর না থাকায় অনেক জায়গায় ফসল জমিতেই পড়ে রয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলায় হিমঘরের সংখ্যা ২২। মোট উৎপাদিত আলু  প্রায় ১২ লক্ষ মেট্রিক টন। কৃষি দপ্তরের উত্তরবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম অধিকর্তা প্রবীর হাজরা বলেন, জলপাইগুড়িতে যে কটি হিমঘর আছে, তাতে প্রায় ৩ লক্ষ ৩১ হাজার মেট্রিক টন আলু রাখা যায়। যদি তাই হয়, তবে বাকি ৮ লক্ষ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন আলুর ব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অনেকে মহাজনের থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। মেখলিগঞ্জ ব্লকের সহকারী কৃষি অধিকর্তা অমিতকুমার দাসের বক্তব্য, আগেরবার দাম অনেক বেশি থাকায় এবার বীজের দাম বেশি থাকা সত্ত্বেও আলু চাষের ক্ষেত্র অনেক বেড়েছে। ফলনও বেশ ভালো। কিন্তু এভাবে দাম পড়ে যাওয়ায় চাষিরা সত্যিই সমস্যায় পড়েছেন।

- Advertisement -

জামালদহের আলুচাষি তপন বর্মন, বিকাশ বর্মনদের বক্তব্য, যে হারে আলুর দাম কমেছে, তাতে চাষের খরচ উঠবে না। এখন জমি থেকে পোখরাজ আলু তোলা হচ্ছে। কিছুদিন পরে তোলা হবে জ্যোতি আলু। তখন দাম পড়ে গেলে না খেয়ে মরতে হবে। একই কথা জানাচ্ছেন উছলপুকুরির আলুচাষি জয়নুল ইসলাম, জগদীশ রায়। দাম না পেয়ে অনেকে জমির আলু জমিতেই রেখে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সরকার ন্যায্যমূল্যে আলু কেনার ব্যবস্থা করুক। ক্রান্তি ব্লকে গচিমারি এলাকার চাষি মন্টু মণ্ডল বলেন, কয়েক বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি॥ ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর পড়ে যাওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছি। বিকল্প রাস্তা না পেয়ে আলু তুলে জমিতে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু লোকসানের ভয়ে আলু তোলার সাহস হয়নি। জলপাইগুড়ির আলু যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে। কিন্তু এবার এখনও পর্যন্ত তেমনভাবে আলু বিপণন শুরু হয়নি। ফলে কৃষকরা বিপন্ন বোধ করছেন।

চ্যাংমারি কৃষক সংঘের সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম বলেন, দাম না বাড়লে চাষিরা বিপাকে পড়বেন। তিনিও সরকারি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। সহায়কমূল্যে সরকারের আলু কেনার দাবিতে সোমবার জলপাইগুড়ির সিপিএম এবং কংগ্রেস নেতারা যৌথভাবে জেলা শাসককে দাবিপত্র দিয়েছেন। জেলা সিপিএমের আহ্বায়ক সলিল আচার্য বলেন, কৃষি উপকরণ, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, বিদ্যুৎ, পেট্রোল, ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আলুর উৎপাদনের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। সময় নষ্ট না করে শীঘ্রই আলুচাষিদের জন্য সহায়কমূল্য ঘোষণা করা উচিত। তবে মাল পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি কর্মাধ্যক্ষ আফিজউদ্দিন আহমেদ কিন্তু এখনও আশা ছাড়েননি। তাঁর কথায়, আলুর দাম বাড়বে আশা করা যেতেই পারে। মিড-ডে মিলের জন্য আলু কিনে বিভিন্ন আইসিডিএস সেন্টার ও স্কুলগুলিতে  জোগান দেওয়া হচ্ছে। এখন দাম একটু বেড়েছে। আগামীতে আলুর বাজার চাঙ্গা হবে বলে আশা রাখছি।