দাম পড়ছে আলুর, ইস্যু হতে পারে ভোটের বাজারে

104

মণীন্দ্রনারায়ণ সিংহ, আলিপুরদুয়ার : আলিপুরদুয়ারে আলুর পাইকারি বাজারদর হুহু করে নেমে যাওয়ায় কৃষকরা চরম সমস্যায় পড়েছেন। বর্তমানে আলুর বাজারদর যেভাবে নেমেছে, তাতে চাষের খরচটুকুও উঠছে না। ফলে কৃষকরা চলতি বছরে আলু চাষে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। অভিযোগ, আলু চাষে কৃষকরা লাভের মুখ দেখতে না পেলেও ফড়ে ও আলু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুটছেন। চলতি বছরে চড়া দামে আলুবীজ ও সার কিনে আলু চাষ করলেও ফসল ওঠা শুরু হতেই কৃষকরা তা জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সবমিলে আলুর বাজারদর নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমশই দানা বাঁধছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে আলুর নিম্নমুখী বাজারদর রাজ্যের অন্যতম ইস্যু হতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহল মনে করছে। এই সূত্রে বিজেপির কিষান মোর্চা রাজ্য সরকারের কাছে অবিলম্বে সহায়কমূল্যে আলু কেনার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদান আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে। শাসকদলের কৃষক সংগঠনের জেলা নেতৃত্বও হাত গুটিয়ে বসে নেই। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
কৃষি বিপণন দপ্তরের সহ অধিকর্তা দীপঙ্কর পণ্ডিত বলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে চলতি বছরে আলিপুরদুয়ারে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদন হতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত সহায়কমূল্যে আলু কেনার কোনও সরকারি নির্দেশিকা আসেনি। মার্চের দিকে হিমঘরগুলিতে আলু সংরক্ষণ শুরু হবে। নির্দেশিকা এলেই সহায়কমূল্যে আলু কেনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত ডিসেম্বর মাসেও আলুর দর লাগামছাড়া হলেও সেই সময় আলুর খুচরো বাজারে তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। চাহিদার তুলনায় সামান্য পরিমাণ আলু প্রতি কেজি ২৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও অধিকাংশ ক্রেতাকে ৪০-৬০ টাকা কেজি দরেই খুচরো বাজারে আলু কিনতে হয়েছে। জানুয়ারির শুরুতেও জলদি জাতের আলুর বাজারদর কৃষকদের কাছে যথেষ্টই লাভজনক ছিল। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে আলুর পাইকারি বাজারদর কেজি প্রতি ৫-৬ টাকায় এসে এসে দাঁড়িয়েছে। আলুর বাজারদর আরও নামতে পারে বলেই কৃষকরা আশঙ্কা করছেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে অধিকাংশ কৃষকের ঘরে আলু উঠবে। ওই সময় সহায়কমূল্যে আলু কেনা না হলে কৃষকরা অভাবী বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। সলসলাবাড়ি এলাকার আলুচাষি মোতালেব হোসেন বলেন, মাত্র ৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করলাম। অথচ ওই আলু চাষে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা খরচ হয়েছে। খরচের তুলনায় অনেক কম দামে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। বনচুকামারি গ্রামের আলুচাষি সুবল রায় বলেন, এবছর আলুবীজের দাম অনেক বেশি হওয়ায় চাষের খরচও বেড়েছে। প্রতি বিঘায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন আলুর যা বাজারদর চলছে তাতে চাষের অর্ধেক খরচও উঠবে না।  সহায়কমূল্যে আলু কেনা না হলে মারাত্মক বিপদে পড়তে হবে।
কৃষি বিপণন দপ্তর সূত্রে জানা খবর, আলিপুরদুয়ার জেলায় হিমঘরগুলিতে ১ লক্ষ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। গত বছর জেলায় প্রায় ৪ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। এবছর সবকিছু ঠিক থাকলে গত বছরের তুলনায় এবারে আরও ১০ শতাংশ বেশি উৎপাদন হতে পারে। আলু সংরক্ষণের সুযোগ না পেলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অভাবী বিক্রি করবেন। ফসল ওঠার মরশুমে নূ্য়নতম ১২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে না পারলে তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। যদিও এখন খুচরো বাজারে আলু প্রতি কেজি ১২-১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিও শুরু হয়েছে। বিজেপির আলিপুরদুয়ার জেলা কিষান মোর্চার সভাপতি সুজিতকুমার সাহা বলেন, আলুচাষিরা খরচের অর্ধেক টাকা তুলতে পারছেন না। রাজ্য সরকার তাঁদের স্বার্থের কথা ভাবছে না। সহায়কমূল্যে আলু কেনার দাবি জানিয়ে ফেব্রুয়ারিতে জেলায় কৃষি দপ্তরের প্রতিটি অফিসে আমরা আন্দোলন করব। আলিপুরদুয়ার জেলা তৃণমূল কিষান খেতমজদুর কংগ্রেসের জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ রায় বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে শীতকালীন সবজি ওঠায় আলুর দর নেমেছে। তবে ফসল পুরোপুরি উঠে গেলে আলুর দর আরও বাড়তে পারে। কৃষকরা যাতে ফসল বিক্রি করে সমস্যায় না পড়েন সেজন্য আমরা রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছি।