নির্মল বিদ্যালয় সপ্তাহেও জল-আগাছায় ঢেকেছে স্কুল

178

মালদা : সারা রাজ্য জুড়ে সাড়ম্বরে নির্মল বিদ্যালয় সপ্তাহ উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে খুদে পড়ুয়াদেরও। গত ২৬ থেকে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচি থেকে মালদা জেলাও বাদ পড়েনি। জেলার স্কুলে স্কুলে গিয়ে পড়ুয়াদের পাঠ পড়ানো হয়েছে স্বচ্ছতার। কিন্তু উদ্‌যাপনের সেই সপ্তাহেই নির্মল পরিবেশের ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না কলাইবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

মালদার হবিবপুর ব্লকের শ্রীরামপুর পঞ্চায়েতের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় রয়েছে স্কুলটি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই দায় যে এটি কোনো স্কুল। মনে হয় যেন কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির জল জমে আগাছায় ভরে গিয়েছে স্কুল ক্যাম্পাসে। জমা জলে জন্ম নিয়েছে শ্যাওলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কীটপতঙ্গও। স্কুলের পড়ুয়াদের ফেলা বিভিন্ন সামগ্রী সেই জমা জলে মিশে ও পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গে স্কুলের একাধিক ঘরের দখল নিয়েছে গোরু, কুকুর, ছাগল। গবাদিপশুর মল-মূত্রেও ভরে গিয়েছে স্কুলের একাংশ। স্কুলের এই বেহাল দশার কথা আমরা একাধিকবার প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছি। কিন্তু তিনি কোনো উদ্যোগই নেননি। মৌখিকভাবে বলার পরেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা লিখিতভাবে বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানান।

স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, পড়ুয়াদের বিনোদনের জন্য স্কুল ক্যাম্পাসে দোলনা থেকে শুরু করে বেশ কিছু খেলার জিনিস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলির চারপাশ জুড়ে জমে রয়েছে জল। ফলে খেলার সময়ও ঘরের মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হচ্ছে খুদে পড়ুয়ারা। ক্লাসে ঢোকার সময়ও মাঠের জল ডিঙিয়ে আসতে হয় তাদের। অনেকসময় সেই জলে পড়ে গিয়ে তারা ভিজে যাচ্ছে। এছাড়া পড়ে গিয়ে কেটে যাচ্ছে অনেকের হাত-পাও। অভিভাবকরা আরও জানান, এত কিছুর পরেও হুঁশ নেই স্কুল কর্তৃপক্ষের। বরং ক্লাসে ঢোকার জন্য জলের মধ্যে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি ইট। অজুহাত দেওয়া হয়েছে এতে শিশুদের যাতায়াতে সুবিধে হবে। কিন্তু সেই রাস্তা তো আরও বিপজ্জনক। একরাশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা।

এবিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, বর্তমান প্রধান শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। পরে ফোনে প্রধান শিক্ষক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। এমনকি প্রধান শিক্ষকের অনুমতি ছাড়া মুখ খুলতে চাননি কোনো শিক্ষকও। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, কলাইবাড়ি প্রাথমিক স্কুলের মোট পড়ুয়া প্রায় ২৭৩ জন। স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন ৭ জন ও একজন পার্শ্বশিক্ষক। কয়েকবছর আগেই জুনিয়ার হাইস্কুলে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রাথমিক স্কুলটি। কিন্তু পর্যাপ্ত কোনো শিক্ষক না থাকায় ঠিকমতো ক্লাসও হয় না। একজন অতিথি শিক্ষক রয়েছেন। তিনিই পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের ক্লাস নেন। বাকি তিনটি শ্রেণি অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে অস্টম শ্রেণির ছাত্রীদের পাশের স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় পড়াশোনার জন্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত সাত বছর ধরেই স্কুল ক্যাম্পাসে এভাবে মাঝেমধ্যে জল জমে থাকে। ওই এলাকায় ও স্কুলের নিকাশি ব্যবস্থা বেহাল হয়ে পড়ায় ক্রমশ বেড়েই চলেছে এই সমস্যা। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য কেউই কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সঞ্জয় কর্মকার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, বৃষ্টি হলেই স্কুলে জল জমে যায়। স্কুলে যেতে ভীষণ সমস্যায় পড়ে পড়ুয়ারা। স্কুলের পরিকাঠামোও ঠিক নেই। সীমানা প্রাচীর না থাকায় অনেক পড়ুয়ারা স্কুলে এসে হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে যায়। আমি অনেকবার প্রধান শিক্ষককে সীমানা প্রাচীর তৈরির জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তিনি শোনেননি। প্রতিবছরই স্কুলের উন্নয়নের জন্য টাকা আসে। কিন্তু তিনি ওই টাকার কী করেন তার কিছুই জানা যায় না। আমাদের এই স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নতি না হলে পড়াশোনার মানেরও উন্নতি হবে না।

স্কুলের মিড-ডে মিলের রান্নাঘরেও সমস্যা রয়েছে। ঘরের ছাউনি ফুটো হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় জল পড়ে। রান্নার জিনিসপত্র ভিজে যায়। অনেক সময় বৃষ্টিতে ভিজেই রান্না করতে হয় রাঁধুনিদের। স্কুলেরই এক রাঁধুনি বলেন, রান্নাঘরে জল পড়ে খড়ি ভিজে যায়। রান্না করতে তখন ভীষণ সমস্যা হয়। এমনকি বালতিও ফুটো হয়ে গিয়েছে। প্রধান শিক্ষককে এসব বারবার বলার পরেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এমনকি স্কুলের মধ্যে কুকুর ঢুকলে তাদের তাড়ানোর জন্যও আমাদের নির্দেশ দেন তিনি। আরেক অভিভাবক বাদলচন্দ্র কর্মকার বলেন, গত বছর স্কুল তহবিলে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আসে। কিন্তু প্রধান শিক্ষক সেই টাকা খরচ করতে না পারায় টাকা ঘুরে যায়। আমি সেসময় স্কুলের সীমানা প্রাচীর তৈরির জন্য বলেছিলাম। কিন্তু প্রধান শিক্ষক গুরুত্ব দেননি।

এমনকি স্থানীয় পঞ্চায়েতও এবিষয়ে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। শ্রীরামপুর পঞ্চায়েতের প্রধান আশালতা মার্ডি বলেন, স্কুলের বিষয়ে আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। যদি কেউ আমাকে সমস্যার কথা জানায়, আমি পঞ্চায়েতের তরফে চেষ্টা করব সেই সমস্যা সমাধানের। মালদা জেলা প্রাথমিক স্কুল পরিদর্শক সুনীতি সাঁপুইকে ফোন করা হলেও তিনি এবিষযে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।