করোনার ধাক্কায় বেসরকারি স্কুলের অধ্যক্ষ এখন ইডলি বিক্রেতা

হায়দরাবাদ : করোনা সংক্রমণের চলতি সংকটকে শুধু হতাহতের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এই মহামারি সারা পৃথিবীর মতো ভারতেও গত কয়েক মাসে কাজের বাজার ভয়ানকভাবে সংকুচিত করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভারী শিল্প থেকে শুরু করে পরিষেবা ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। শিক্ষাক্ষেত্রকে সংক্রমণ কতটা প্রভাবিত করেছে, তার উদাহরণ বোধহয় মুরগনি রামবাবু। তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদ শহরের এক বেসরকারি স্কুলের অধ্যক্ষ রামবাবু এখন ইডলি-ধোসা বিক্রি করে কোনওরকমে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁর স্ত্রীও দোকান চালাতে স্বামীকে সাহায্য করছেন।

দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর রামবাবুকে পথে বসিয়েছে কোভিড-১৯ ভাইরাস। সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর স্কুল বন্ধ। পড়ুয়ারা আবার কবে স্কুলে আসতে পারবে, এই মুহূর্তে তা বলা কঠিন। স্কুল বন্ধ হতে কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের বেতন দেওয়া বন্ধ করেছে। লকডাউন চলাকালীন সংসার চালাতে জমানো টাকার অনেকটাই ফুরিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। লকডাউন শিথিল হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ঝাঁপ বন্ধই। রামবাবু তাই পেশা বদলেছেন। শিক্ষক থেকে হয়েছেন ইডলি বিক্রেতা। তিনি বলেন, ইডলি-ধোসা বিক্রির জন্য ২ হাজার টাকা দিয়ে ঠেলাগাড়ি কিনেছি। প্রথম প্রথম ইতস্তত বোধ হত। স্ত্রী শুরু থেকে পাশে আছেন। সব খরচ মিটিয়ে এখন প্রতিদিন ২০০ টাকা লাভ হচ্ছে। স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে অবশ্য মাসে ২২ হাজার টাকা বেতন পেতেন তিনি।

- Advertisement -

হায়দরাবাদের শিক্ষকের দুরবস্থা কোনও ব্যতিক্রম নয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ সহ বিভিন্ন রাজ্যে বেসরকারি স্কুলশিক্ষকদের সংকট ক্রমশ গভীর হচ্ছে। শহরাঞ্চলের বেসরকারি স্কুলগুলির বহু শিক্ষক থাকা-খাওয়ার খরচ সামলাতে না পেরে গ্রামে ফিরে গিয়েছেন। তেলেঙ্গানার বেসরকারি স্কুলশিক্ষকদের একটি সংগঠনের প্রধান সাব্বির আলি বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ুয়াদের কাছ থেকে ফি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ছাত্রছাত্রীর মা-বাবা চাকরি হারিয়েছেন। তাঁদের পক্ষেও এই মুহূর্তে ফি জমা দেওয়া কঠিন। বেসরকারি স্কুলশিক্ষকদের বেতন পড়ুয়াদের ফি থেকে আসে। সেই টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু জায়গায় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রেখেছে। কিছু স্কুলে অনলাইনে ক্লাস শুরু হলেও এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হতে সময় লাগবে।

প্রায় একই কথা বলেছেন পাটনার দানাপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সঞ্জয় মালিক। তাঁর বক্তব্য, আমরা অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছি। কিন্তু এখনও অন্তত ৭০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক ফি জমা করতে পারেননি। অনেকের কাছে স্মার্টফোনও নেই। আমরা এখন শুধু টিকে থাকার জন্য লড়াই করছি। তেলেঙ্গানার নালগোন্ডার বাসিন্দা বাদিতি রবি একটি স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। বেতন মাসে ১৬ হাজার টাকা। লকডাউন শুরু হওয়ার পর তাঁর আয় শূন্যে এসে ঠেকেছে। রাঁচির লগনলাল মাহাতো সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তাঁর আয়ও এখন শূন্যে নেমে এসেছে। পাটনার অভিষেক রঞ্জন, শেখপুরার বিদ্যাসাগর… তালিকার শেষ কোথায় বলা কঠিন। ঠিক ততটাই কঠিন এটা বলা যে, আবার কবে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর থেকে করোনার ছায়া দূর হবে।