প্রিয়-আবেগে চলে আসছে বিদেশে থাকা মিছিলের নাম

131

অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ : কংগ্রেস জমানায় উত্তরবঙ্গের রাজনীতির আঁতুড় ছিল কালিয়াগঞ্জের মণিবাগপাড়ার দাশমুন্সি ভবন। একসময়ে সারি সারি গাড়ির লাইন, নেতা-কর্মীদের ভিড়ে গমগম করত এই বাড়ি। কিন্তু একুশের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে সেই বাড়িতে নেতাদের আনাগোনা নেই। জননীরবতায় আচ্ছন্ন বাড়ির প্রতিটি ক্ষেত্র। আজ এই বিশাল বাড়িটিতে প্রিয় নেই। দীপা থেকেও নেই। তাই ভোটের মরশুমেও যেন শূন্যতা গ্রাস করছে এই দাশমুন্সি বাড়িকে।

ভারতের রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির মিথ এখনও নাড়া দেয় উত্তর দিনাজপুর জেলার জনমানসে। ২০০৮ সালে দুর্গাপুজোর পরপরই কালিয়াগঞ্জের বাড়িতেই অসুস্থ হয়ে কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে দিল্লির এইমসে ভর্তি হন প্রিয়রঞ্জন। দীর্ঘ নয় বছর লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে ২০১৭ সালের শেষ প্রান্তে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সকলের প্রিয়দা। একসময়ে রাজ্যে ভোটের আবহ তৈরি হতেই ভিড় জমত কালিয়াগঞ্জে তাঁর বাড়িতে। উত্তরবঙ্গের কংগ্রেসি রাজনীতির আঁতুড় ছিল এই বাড়ি। নেতা তৈরির কারিগর ছিলেন প্রিয়রঞ্জন। এই বাড়িতে বসেই তৈরি হত আগামীদিনের রাজনৈতিক পরিকল্পনা। বুথ পর্যায়ে কর্মী থেকে দলীয় নেতৃত্বদের ঠান্ডা মাথায় ভোট পরিচালনার অঙ্ক নিজে হাতে কষে দিতেন সকলের প্রিয়দা। তবে তাঁর অসুস্থতার পরে প্রিয়-জায়া এই জেলার কংগ্রেসের হাল ধরেন। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে উত্তর দিনাজপুর থেকে লক্ষাধিক ভোটে জেতেন দীপা দাশমুন্সি। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতেন, প্রিয়দার অপরিসমাপ্ত কাজ ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করবেন দীপা। প্রিয়রঞ্জনের ভাবধারাকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলছিলেন দীপা। কিন্তু রাজ্যে ২০১১ সালে রাজ্যের রাজনৈতিক পটচিত্র পরিবর্তনের পর থেকে এই জেলায় কংগ্রেসের বহমান নদীতে চর পড়তে শুরু করে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দীপা-বধে প্রিয়ভ্রাতা সত্যরঞ্জনকে কার্যত বিভীষণের ভূমিকায় অবতীর্ণ করিয়ে এই জেলার কংগ্রেসের শেষ শিকড়টুকু উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। পরিকল্পনায় সফলতা পেয়ে কার্যত নিজের নাক কেটে যাত্রাভঙ্গের ন্যায় বামপ্রার্থী অল্প কিছু ভোটে এই  লোকসভা কেন্দ্রে জয় লাভ করেন।  পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে চলে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গের কংগ্রেস রাজনীতির পীঠস্থান ছিল এই বাড়িটি বলে জানান প্রতিবেশী প্রদীপকুমার পাল। তিনি বলেন, সুদূর কোচবিহার থেকে মালদার সমস্ত কংগ্রেস নেতাদের এই বাড়িতে ছিল আনাগোনা। গনি খান, রুবি নূর, বিপ্লব খাঁ ছাড়াও অধীররঞ্জন চৌধুরীর মতো আরও অনেক নেতারা আসতেন। দুর্গাপুজো এবং ভোটের সময়ে এই বাড়িতেই মানুষের ভিড় জমত। এখন পুজো বন্ধ। রাজনৈতিকভাবে আর কোনও চর্চা দেখি না এই বাড়িটিতে। একজন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে চলে বাড়িটির দেখাশোনার কাজ। দুর্গাপুজো এবং ভোটের সময় আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। একসময়ে এই বাড়ির প্রতিটি ঘরে জ্বলত আলো। এখন সন্ধ্যা লাগতেই বাড়িটি যেন অন্ধকারের গ্রাসে চলে যায়।

কালিয়াগঞ্জের কংগ্রেস নেতা সুজিত দত্ত বলেন, আমার দ্বিতীয় বাড়ি ছিল এই দাশমুন্সি ভবন। ছাত্রাবস্থা থেকে প্রিয়দার কাছে থেকে রাজনীতির পাঠ নিয়েছি। এমন সুসংগঠক, নিষ্ঠাবান, সৎ নেতার এই সময়ে রাজনীতিতে বড় অভাব। দীপা দাশমুন্সি সবসময়ে লড়াই করে আমাদের রাজনৈতিক মনোবল চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। প্রিয়দার একমাত্র পুত্র মিছিলের প্রতি এখনও সাধারণ মানুষ আবেগপ্রবণ। তিনি বিদেশে পড়াশোনায় ব্যস্ত। মিছিল ঠিক করবেন, তিনি আগামীদিনে কোন দিকে যাবেন। তবে প্রিয়দার অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবাযিত করতে আগামীতে আমরা লড়াই করব। মণিবাগের এই বাড়িতে এসে চোখ বন্ধ করলে আজও সবাই জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রিয়দা চলে যাওয়ার পর কালিয়াগঞ্জের কংগ্রেস বিধায়ক প্রমথনাথ রায়, প্রাক্তন পুরপিতা অরুণ দেসরকার, কংগ্রেস নেতা শ্যামলেশ ঘোষের মৃত্যু আমাদের অসহায় করে দিয়েছে। তাই প্রিয়দাকে স্মরণের মধ্যে দিয়ে মানুষের মধ্যে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনে অবতীর্ণ হব।

কালিয়াগঞ্জের সিপিএমের নেতা ভারতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, আমরা তাঁর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। এমন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আমরা বিরোধীদল হিসেবে দীর্ঘদিন লড়াই করেছি। কালিয়াগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক তপন দেবসিংহ বলেন, রাজনীতির চাণক্য ছিলেন প্রিয়রঞ্জন। প্রিয়রঞ্জনের সঙ্গে আমার বাবার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা যে দলই করি না কেন, তাঁর প্রতি আমাদের সম্মান সর্বক্ষণ রয়েছে।