মৃতদেহ সরানো নিয়ে সমস্যা উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : চিকিৎসাধীন কোনও রোগীর মৃত্যুর পর তাঁর শবদেহ ওয়ার্ড থেকে বের করা নিয়ে সমস্যায় পড়েছে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। করোনায় সংক্রামিত রোগী হলে যেমন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, তেমনই সাধারণ রোগে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা হচ্ছে। পালি পার্টি বা সাফাইকর্মীদের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে, পাশাপাশি তাঁদের বাড়ির এলাকায় সামাজিক বয়কটের মুখে পড়তে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার যে দুজন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল তাঁদের দেহ মেডিকেল থেকে বের করা এবং সৎকার করা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক চেষ্টায় শুক্রবার ভোর চারটায় মরদেহ মেডিকেল থেকে বের করে দাহ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। মেডিকেল সুপার ডাঃ কৌশিক সমাজদার বলেন, এটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত রোগীদের দেহ সরাতে সমস্যা হচ্ছিল। এখন সাধারণ রোগে মারা গেলেও সেই মৃতদেহ নিয়ে খুবই সমস্যা হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেলে স্বাভাবিক সময় প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ জন চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যু হয়। এই মৃতদেহগুলি ওয়ার্ড থেকে বের করা এবং প্রয়োজনে মর্গে পাঠানোর দায়িত্ব পালি পার্টির। কিন্তু গত মার্চ মাসে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে মৃতদেহ ওয়ার্ড থেকে সরানো এবং অন্য কাজ করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। পালি পার্টি এবং সুইপারদের কেউই মৃতদেহে হাত দিতে চাইছেন না। তাঁদের বক্তব্য, কে করোনায় সংক্রামিত, কে নন তা বোঝা যাচ্ছে না। ফলে মৃতদেহ সরাতে গিয়ে যে কেউ করোনায় সংক্রামিত হতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে গত মার্চ মাসের শেষে করোনায় সংক্রামিত হয়ে মৃত কালিম্পংয়ে মহিলা এবং শিলিগুড়ির এক রেলকর্মীর মরদেহ রেসপিরেটরি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (রিকু) থেকে সরাতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। পার্সোন্যাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) দেওয়ার পরেও পালি পার্টির কর্মীরা প্রথমে মরদেহ সরাতে রাজি হননি। প্রশাসনিক চাপে পরবর্তীতে তাঁরা মরদেহ সরান।

- Advertisement -

সেই সময় থেকেই টানা আড়াই মাস ধরে সমস্যা চলছে মেডিকেলে। করোনায় সংক্রামিত হয়ে কোনো রোগী মারা গেলে তাঁর মরদেহ ওয়ার্ড থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। সর্বাধিক চার ঘণ্টা ওয়ার্ডে মরদেহ রাখা যায়। কিন্তু কর্মীরা মরদেহে হাত দিতে অস্বীকার করায় নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এমনকি ইদানীং সাধারণ ওয়ার্ডে কেউ মারা গেলেও তাঁর দেহ সরাতে রাজি হচ্ছেন না কর্মীরা। তাঁদের দাবি, মেডিকেলে কাজ করে বাড়িতে ফেরার পর এলাকাবাসীর ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মধ্যে পড়শিরা যদি খবর পেয়ে যান যে করোনায় মৃতের দেহে হাত দিয়েছেন তাহলে তো এলাকায় থাকতে দিতে চাইছেন না। ফলে তাঁরাও পরিবারের স্বার্থে এই কাজ করতে চাইছেন না।

বৃহস্পতিবার মেডিকেলের রিকু বিভাগে চিকিৎসারত চম্পাসারি এবং নাগরাকাটার দুই রোগীর মৃত্যু হয়। দুজনেরই করোনা পজিটিভ ছিল। দুপুরে মৃত্যুর পর লালার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট না আসায় দেহ রাত সাতটা পর্যন্ত শয্যাতেই রাখা ছিল। রাতে পজিটিভ রিপোর্ট আসায় দেহ দ্রুত সৎকার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু দেহ সরাতে রাজি হয়নি পালি পার্টি। ফলে সমস্যা তৈরি হয়। রাতভর মৃতদেহ সরানো নিয়ে চাপানউতোর চলে। শুক্রবার ভোরে অন্য কর্মী এনে দেহ মেডিকেল থেকে বের করে দাহ করার জন্য সাহুডাঙ্গি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।

মেডিকেলের প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ সন্দীপ সেনগুপ্ত বলেন, আমরা একটা ভয়াবহ সমস্যায় পড়েছি। কিছু মানুষ ভুল ধারণা থেকে হাসপাতালের কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে ঝামেলা করছেন। প্রশাসন বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছু মানুষ কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না। এঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।