দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : বেতন সহ নানা দাবি নিয়ে সারা রাজ্যের পাশাপাশি উত্তর দিনাজপুরের পার্শ্বশিক্ষকরাও আন্দোলনে নেমেছেন। কলকাতায় সংগঠনের অনশন কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়ে জেলায় কর্মবিরতিতে নেমেছেন পার্শ্বশিক্ষকরা। গত সোমবার থেকে জেলার প্রাথমিক, উচ্চপ্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলের সমস্ত পার্শ্বশিক্ষকরা কাজ বয়কট শুরু করেছেন। তাঁরা স্কুলে এলেও খাতায় সই করছেন না। এমনকি পঠনপাঠন সহ স্কুলের কোনো কাজেও অংশ নিচ্ছেন না। ফলে স্কুলগুলিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ স্কুলেই এখন পরীক্ষা চলছে। কিন্তু পার্শ্বশিক্ষকরা না থাকায় পরীক্ষা পরিচালনা করতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এছাড়াও দৈনন্দিন পঠনপাঠন সহ মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষও। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বঞ্চনার শিকার। রাজ্য সরকার দাবি না মানার কারণেই আন্দোলনের পথে যেতে হয়েছে।

জেলার বেশিরভাগ স্কুলে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের টেস্ট চলছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। স্থাযী শিক্ষকদের পাশাপাশি পার্শ্বশিক্ষকরাও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে থাকেন। এছাড়াও পরীক্ষার খাতা দেখা এবং দৈনন্দিন পঠনপাঠনেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা পালন করে থাকেন। জানা গিয়েছে, উত্তর দিনাজপুর জেলায় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। এঁদের মধ্যে পার্শ্বশিক্ষকের সংখ্যা ২১০০। পঁচিশজন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক। পার্শ্বশিক্ষক ঐক্য মঞ্চের জেলা নেতা নীতিশ সরকার বলেন, উচ্চপ্রাথমিকে ৩৩ হাজার এবং প্রাথমিকে ২৫ হাজার বেতন পাওয়ার কথা আমাদের। কিন্তু আমরা পাই, ১৩ হাজার ও ১০ হাজার। কেন্দ্রের দেওয়া ৬০ শতাংশ ও রাজ্যের ৪০ শতাংশ  টাকা আমাদের দিতে হবে। যতদিন না পর্যন্ত এই টাকা আমরা পাচ্ছি ততদিন আন্দোলন চলবে এবং স্কুল বয়কট চলবে। নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি, পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন পার্শ্বশিক্ষকদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছেন।

তাঁদের এই আন্দোলনের ফলে জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রায়গঞ্জ করোনেশন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শুভেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, এখন টেস্ট পরীক্ষা চলছে। তাই ক্লাস বন্ধ রেখেছি। পার্শ্বশিক্ষকেরা না আসায় ক্লাস চললে সমস্যায় পড়তে হত। রায়গঞ্জ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষক নীলমাধব নন্দী বলেন, টেস্ট চলছে। স্থায়ী শিক্ষকরাই গার্ড দিচ্ছেন। পঠনপাঠন শুরু হলে পার্শ্বশিক্ষকেরা না এলে অবশ্যই সমস্যা হবে। রায়গঞ্জ দশম শ্রেণি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সীমা নাগ বলেন, পার্শ্বশিক্ষকেরা না আসায় আমাদের সমস্যা হচ্ছে। স্কুলে একদিকে টেস্ট চলছে, অন্যদিকে ক্লাস চলছে। তাঁরা যদি না আসেন ক্লাস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব। শিক্ষাবন্ধুকে দিয়ে ক্লাস করানো যায় কিনা তাও ভাবছি। বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল দেখেন পার্শ্বশিক্ষক। উনি অনুপস্থিত থাকায় খুব সমস্যা হচ্ছে। বাহিন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বি পাল বলেন, বিদ্যালয়ে ৪ জন পার্শ্বশিক্ষক রয়েছেন। বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে তাঁরা এলেও খাতায় স্বাক্ষর করছেন না। ওদের তো গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তারা না এলে কিছু করার নেই। হাতিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অনিরুদ্ধ সিন্হা বলেন, পার্শ্বশিক্ষকেরা না আসায় মাঝেমধ্যে শিক্ষাকর্মীদের দিয়ে পরীক্ষার কাজ করাতে হচ্ছে। কারণ, পার্শ্বশিক্ষকেরা বিদ্যালয়ে পঠনপাঠন সহ যাবতীয় কাজে য়থেষ্ট সাহায্য করেন।

দেবীনগর কৈলাসচন্দ্র রাধারানি বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক ডঃ উৎপল দত্ত বলেন, বিদ্যালয়ে পাঁচজন পার্শ্বশিক্ষক রয়েছেন। পঠনপাঠন, মিড-ডে মিল, সাইকেল বিলি, পোশাক বিলি, পরীক্ষার গার্ড, খাতা দেখা, রেজাল্ট তৈরি সহ আনুষঙ্গিক কাজকর্ম তাঁরা করেন। তাঁরা তাঁদের ন্যায্য বেতনক্রমের সমর্থনে আন্দোলনে নেমেছেন। বিদ্যালয়ে না আসায় খুবই সমস্যা হচ্ছে। টেস্ট পরীক্ষার সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা শুরু হওয়ায় শিক্ষাকর্মীদের দিয়ে পরীক্ষার হলে গার্ডের কাজ করাতে হচ্ছে। কবে সমস্যার সমাধান হবে বুঝতে পারছি না। এদিকে রায়গঞ্জ সদর সার্কেলের শিক্ষাবন্ধু সজীব গোস্বামী জানান, এই সার্কেলে ১৯টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল রয়েছে। অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক যদি কোনো বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস অথবা পরীক্ষার হলে গার্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন অবশ্যই যাব। সমগ্র শিক্ষা অভিয়ানের জেলা কো-অর্ডিনেটর সোমনাথ চক্রবর্তী বলেন, পার্শ্বশিক্ষকেরা না আসায় সমস্যা হচ্ছে। তবে এখন স্কুলগুলিতে পরীক্ষা চলায় বেগ পেতে হচ্ছে। চাইল্ড রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে রয়েছে। নভেম্বরের মধ্যেই রিপোর্ট পাঠাতে হবে।