সেচহীন ফোস্কাডাঙ্গায় চাষে সমস্যা, ভিনরাজ্যে পাড়ি বাসিন্দাদের

48

মণীন্দ্রনারায়ণ সিংহ, আলিপুরদুয়ার : চাষের জমি আছে, কিন্তু সেচের জল নেই। বছরে একবার ফসল ফলাতেই কৃষকরা চাতকপাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন। প্রকৃতির আশীর্বাদে ফসল ফললেও মাঝেমধ্যে সেখানে চলে বুনো হাতির হানাদারি।

আলিপুরদুয়ারের কালচিনি ব্লকের বনচুকামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের আদিবাসী অধ্যুষিত ফোস্কাডাঙ্গা গ্রামে কয়েকশো বিঘা জমি সেচের জলের অভাবে বছরের বেশিরভাগ সময় অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে। ফলে সেখানকার কৃষক পরিবারগুলিকে রুটিরুজির টানে শ্রমিক-মিস্ত্রির কাজ করতে আলিপুরদুয়ার শহরে ছুটতে হয়। এলাকার অনেক যুবক শ্রমিকের কাজে ভিনরাজ্যেও পাড়ি দিয়েছেন। ভোটের মুখে নেতাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে হাসছেন বাসিন্দারা।

- Advertisement -

বনচুকামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পায়েল ঘোষ সাহা বলেন, চাষিরা তাঁদের সমস্যার কথা আমাকে কোনওদিনও জানাননি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। পঞ্চায়েত এলাকায় কয়েকটি পানীয় জলের টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। সমস্যা থাকলে যথায়থ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পোরো নদীর পাশের জনপদ ফোস্কাডাঙ্গা। আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে অন্যান্য জনজাতির মানুষও রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গ্রামে ভোট চাইতে আসছেন। তাঁরা বাসিন্দাদের সেচ, পানীয় জল, সরকারি আবাস সহ অন্যান্য উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। আর হাসিমুখে তা শুনে মাথা নাড়ছেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের বক্তব্য, কৃষিনির্ভর গ্রামে বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আগেও এরকম অনেক প্রতিশ্রুতি তাঁরা শুনেছেন। ভোট হয়ে গেলে কেউই আর গ্রামে পা রাখবেন না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমন চাষ হলেও বুনো হাতি গ্রামে ঢুকে অনেক সময় ধানখেতের ক্ষতি করে চলে যায়। সেচের জল না থাকায় বিকল্প চাষেরও উপায় নেই বলে গ্রামবাসীরা জানান।

স্থানীয় কৃষক ছোটন ওরাওঁ বলেন, আমার পাঁচ বিঘা জমিতে বছরে একবারই জমিতে আমন চাষ করি। বৃষ্টির অপেক্ষায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। বৃষ্টি ভালো হলে চাষ করা সম্ভব হয়। এখানে মাটির নিজের জল তোলা কঠিন। নদীর জল দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করা হলে সুবিধা হত। জমিতে চাষ করতে না পেরে বছরের বেশিরভাগ সময় রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে শহরে গিয়ে কাজ করতে হয়।

আরেক কৃষক শনিচারোয়া ওরাওঁ বলেন, এখানে অন্যান্য জায়গার মতো ধানের ভালো ফলন হয় না। এমনকি বর্ষাকালেও অনেক সময় সময়মতো বৃষ্টি না হলে ধান গাছ শুকিয়ে গিয়ে ফলন মার খায়। চাষের জমি থাকলেও আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। সঞ্জয় ওরাওঁ নামে এক যুবক বলেন, কয়েক বছর আগে কেরলে গিয়েছিলাম। রাজমিস্ত্রির কাজ করে মাসে ২২ হাজার টাকা পেতাম। কয়েক বছরের রোজগারের সঞ্চিত টাকা এনে খড়ের ঘর বদলে টিনের চালের ঘর বানিয়েছি। শরীরটা ভালো নেই তাই গত তিন বছর থেকে বাড়িতেই আছি। এখানকার জমিতে চাষ হয় না বললেই চলে। ভালো রোজগারেরও উপায় নেই।

মাসখানেক আগে বুনো হাতি এসে শুকা ওরাওঁ নামে এক বাসিন্দার ঘর ভেঙে দিয়ে গিয়েছে। ভাঙা ঘর জোড়াতালি দিয়ে পরিজনদের নিয়ে তাঁকে রাত কাটাতে হচ্ছে। বীণা ওরাওঁ বলেন, একটি কল থেকে অনেক পরিবারকে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হয়। গ্রামে একটি টিউবওয়েল বসানোর জন্য পঞ্চায়েতকে অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু কার কথা কে শোনে। বিমল ওরাওঁ নামে এক বৃদ্ধ বলেন, আমার বসতবাড়ি ছাড়া কিছু নেই। সরকারি প্রকল্পের ঘর জোটেনি, বার্ধক্য ভাতা চালু হয়নি। তাই এই বয়সেও মজুর খাটতে শহরে ছুটতে হয়।