মোমবাতি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয় রোগীদের

230

দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গেলে ঘর থেকে নিয়ে আসতে হবে মোমবাতি আর মশারি। এটাই এখন প্রতিদিনের ছবি হয়ে উঠেছে রায়গঞ্জ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা প্রসূতিদেরও বাড়ি থেকে মোমবাতি আর মশারি নিয়ে আসতে হয়। কারণ, মহারাজাহাট এলাকায় রয়েছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। আর লোডশেডিং-এর জন্য কার্যত বিখ্যাত এই এলাকা।

রাতে আলো না থাকায় প্রবল সমস্যায় পড়তে হয় রোগী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো জেনারেটর নেই। একমাত্র ভরসা ইনভার্টার। অভিযোগ, লোডশেডিং চলাকালীন দু-একটি ঘরে টিমটিমে আলো দেখা গেলেও অধিকাংশ বিভাগ অন্ধকারে ডুবে থাকে। সঙ্গে গরম আর মশার কামড় একেবারে ফ্রি। গত বৃহস্পতিবার সন্ধে থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত টানা লোডশেডিং-এর শিকার হতে হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সবাইকে। নাজেহাল দশা হয় সবার। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এটা যে একটা ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রাতে তা বোঝা ভার। অ্যাম্বুলেন্সের আলোয় রোগীদের নিয়ে পরিবারের লোকজনকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকতে হয়। রোগীদের আনা মোমবাতির ওপর ভরসা করতে হয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। আর তা না হলে অন্ধকারে ডুবে থাকে ওয়ার্ড।

রোগী ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গেলে বাড়ি থেকে মোমবাতি আর মশারি আনা বাধ্যতামূলক। কেউ যদি ভুলবশত তা না আনেন, তবে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। যদিও ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিটি ওয়ার্ডে ইনভার্টার রয়েছে। লোডশেডিং হলেও অন্তত ৫ ঘণ্টা প্রতিটি ওয়ার্ডে আলো থাকে। তবে সেখানে কোনো জেনারেটর নেই। তার জন্য জেলা ও রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরকে জানানো হয়েছে। কিন্তু লোডশেডিং-এর দাপটে ত্রাহিরব উঠেছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভরতি থাকা রোগীদের। সুমিতা মাহাতো নামে এক প্রসূতি বলেন, গরম আর মশার উপদ্রবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকা যাচ্ছে না। একবার লোডশেডিং হলে কখন বিদ্যুৎ আসবে, কেউ বলতে পারে না।

ট্যাংরার বাসিন্দা সুভাষ বর্মন বলেন, দুর্ঘটনায় পা কেটে গিয়েছিল। আজ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ড্রেসিং করাতে এসেছিলাম। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে তিক্ত অভিজ্ঞতা হল। একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে মশার উপদ্রব। কখন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বেরোব, তারই প্রহর গুনছিলাম। রাজীবনগরের বাসিন্দা মণিরুল ইসলামও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে একগুচ্ছ অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার আমার স্ত্রী পেট ব্যথা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভরতি হয়েছে। প্রথমে মোমবাতি আর মশারি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে মোমবাতি আর মশারি নিয়ে যাই। লোডশেডিং হলে রোগীদের কত অসুবিধে হয় তা গতকাল দেখেছি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিছানা ও টয়লেটগুলি ভীষণ অপরিষ্কার। নিকাশি ব্যবস্থা নেই। চারদিকের পরিবেশও নোংরা। তার জন্যই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মশার এত উপদ্রব।

স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ঝুমা বিশ্বাস বলেন, জেনারেটর না থাকায় মাঝেমধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অন্ধকারে ডুবে থাকে। আবর্জনা জমা করার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের যেখানে-সেখানে আবর্জনা পড়ে থাকে। গ্রামবাসী স্বাধীন দাস, বুরণ সরকার সহ আরও অনেকেরই বক্তব্য, ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার কোনো পরিকাঠামোই নেই। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও পরিকাঠামো না থাকায় রোগীরা যথাযথ পরিসেবা পাচ্ছেন না। স্থানীয় বাসিন্দা তথা মহারাজাহাট ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক উত্তম চট্টোপাধ্যায় বলেন, জেনারেটর না থাকাটাই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। এই এলাকায় লোডশেডিং-এর দাপট বেশি। ইনভার্টার থাকলেও সেসব বেশি সময় কাজ করে না। তাই গরমে ভীষণ কষ্ট হয় রোগীদের। সন্ধে নামলেই অন্ধকারে ডুবে যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে জঙ্গল হয়ে যাওয়ায় ও নিকাশি নালা না থাকায় মশার উপদ্রব খুব বেশি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ঠিকঠাক পরিসেবা দেন। কিন্তু পরিকাঠামো না থাকায় তার ফল ভোগ করতে হয় রোগীদের।

এপ্রসঙ্গে উত্তর দিনাজপুর জেলাপরিষদের বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ পূর্ণেন্দু দে বলেন, ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শীঘ্রই একটি জেনারেটর দেওয়ার ব্যাপারে জেলাপরিষদে আলোচনা করব। রামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান অমল সরকার বলেন, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমরা কোনো জেনারেটর দিতে পারব কিনা তা নিয়ে আলোচনা করব। এব্যাপারে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রকাশ মৃধা বলেন, জেলার প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জেনারেটর দেওয়ার বিষয়টি রাজ্যকে জানানো হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে ইনভার্টার রয়েছে। ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক সন্দীপ বাগ বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টানা লোডশেডিং ছিল। সকালে একবার কারেন্ট আসার পর ফের টানা লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে জঙ্গল থাকার অভিযোগ ঠিক নয়।