বঙ্গ সংস্কৃতিতে ‘গোলি মারো’র অনুপ্রবেশে চিন্তিত বিশিষ্টরা

457

কলকাতা: ‘দেশ কী গদ্দারো কো, গোলি মারো শালো কো।’ দিল্লির রাজপথে স্লোগানটি শোনা গিয়েছিল প্রথম। তাও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর গলায়। গত বছর দিল্লি বিধানসভার প্রচার পর্বে রিঠালার এক জনসভায় এই বিতর্কিত স্লোগান তুলেছিলেন অর্থ মন্ত্রকের ডেপুটি অনুরাগ সিং ঠাকুর। বাকিটা ইতিহাস।পরবর্তী কালে কুখ্যাত এই স্লোগান শোনা যায় নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে শাহীনবাগ আন্দোলন’কে কেন্দ্র করে৷ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে ‘দেশ কি গদ্দারো কো’ স্লোগান তোলেন বিজেপির দুই শীর্ষ নেতা কপিল মিশ্র ও প্রবেশ সিং ভার্মা। এই স্লোগান ঘিরে তুমুল বিতর্কে জড়ান তিন বিজেপি নেতা-ই। দেশ জুড়ে উঠেছিল ব্যাপক সমালোচনার ঝড়। কিন্তু আটকানো যায়নি স্লোগানটিকে। শাস্তি পাননি অভিযুক্ত নেতারাও। দিল্লির রক্তাক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মারমুখী জনতার কণ্ঠে একাধিকবার শোনা গেছে এই স্লোগান। এবার একুশের নির্বাচনের আগে বাংলাতেও একই স্লোগান শোনা গেল।

মঙ্গলবার তৃণমূলের শান্তি মিছিলে ওঠে এই স্লোগান। তাতে ছিল সামান্য সংশোধন। ‘দেশ’-র বদলে উঠে এল ‘বঙ্গাল কী গদ্দারো কো’। এবার তা শোনা গেল হুগলিতে। যদিও, এবার বিজেপির মিছিল থেকেই। দলমত যাই হোক, বাংলার মাটিতে এই স্লোগান ঘুম উড়িয়েছে শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মানুষের। তাঁদের মতে, এই স্লোগান বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরুদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে কে গদ্দার? কাকেই বা ‘গোলি মারা’ উচিত? গুলি মারার লাইসেন্স-টাই বা দিচ্ছে কে? উত্তর ভারতীয় অ-সংবেদনশীল রক্তাক্ষয়ী অপসংস্কৃতির বুলেট যদি আছড়ে পড়ে চৈতন্যদেব, চন্ডীদাস, রামমোহন রায়, রামপ্রসাদ, বিবেকানন্দ বা বিদ্যাসাগরের বাংলায়, তবে রাজ্যের ভবিষ্যৎ-ই বা কী; সে নিয়ে তর্জায় মেতেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

- Advertisement -

দার্শনিক অধ্যাপক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বলেন, ‘এ এক অশনী সংকেত। বাংলার বুকে যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কে গদ্দার, কাকেই বা গুলি, কে তার দায়িত্ব নেবে, এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে। উত্তর ভারতীয় অপসংস্কৃতির বীজ এভাবে যদি বাংলায় ছড়ায়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হতে পারে।’ নৃসিংহবাবুর মতে, কেন্দ্রের উস্কানিতেই হচ্ছে এসব। এ রাজ্য বৈষ্ণব’রা আগে রামনবমী পালন করতেন। মহাপ্রভু নির্দেশিত পথ মেনেই তা পালিত হতো৷ এখন তাতে তলোয়ার নাচানো হচ্ছে। সংস্কৃতির অবক্ষয় একেই বলে৷ নৃসিংহবাবু বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে মন্দ দিয়ে মন্দ মেটানো সম্ভব না। তার জন্য ভালো হওয়া জরুরি৷ এই ধরনের স্লোগান সেই ভালো হওয়ার পথে বাঁধা।’

নৃসিংহবাবুর উল্টো পথে হেঁটে প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ের মতে, “এ সবই বামেদের দান। নকশালরা গুলির ভাষায় কথা বলতেন। তার কার্বন কপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি শুধু তার প্রত্যুত্তর দিচ্ছে।” তথাগত বলেন, ‘জাতির জনক গান্ধীজি মাথায় থাকুন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি এক গালে থাপ্পড় খেলে অন্য গাল বাড়িয়ে দেওয়ার যুগ এটা নয়। তৈরি থাকতে হবে পালটা জবাব দেওয়ার জন্য। এই স্লোগান তারই প্রতিফলন।’ তিনি এও জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধি ১৫৩ ধারায় প্রকাশ্যে উস্কানিমূলক ভাষন বা কথা দন্ডনীয় অপরাধ। সে ক্ষেত্রে রাজ্য কেন কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না? কেন আইনব্যবস্থাকে মর্জি-মাফিক ব্যবহার করছে শাসক দল?

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র সুখেন্দু শেখর রায় বলেন, ‘বাংলার মাটিতে এই স্লোগানের ঠাঁই নেই। মঙ্গলবার আমাদের দলের শান্তিমিছিলেও তা শোনা যায়। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়। ফলে এই অপসংস্কৃতি থেকে বাঁচার দায়িত্ব আমাদের।’ সুখেন্দু জানান, সংক্রামক ব্যাধির আকার নিচ্ছে বিজেপি। সারা রাজ্যে ছড়াচ্ছে সংক্রমণ। যে দেশের কেন্দ্রীয় শাসক দল এই ভয়াবহ স্লোগানের জন্য তার দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করে না, তারা পরোক্ষে আম জনতাকে গুলি মারার সংস্কৃতিতে প্রলুব্ধ করছে৷ বাংলায় এটা হতে দেওয়া যায় না। প্রয়োজনে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।

বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, ‘বাংলার মাটিতে এসব কী হচ্ছে? এই কী রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজির বাংলা? তৃণমূল-বিজেপি মিলে এবার রাজ্যটাকে ছারখার করবে। বাংলার বুকে এই স্লোগানের যত নিন্দা করা হয় ততই কম।’ প্রবীন সাংসদের মতে, তৃণমূলের হাত ধরে এই রাজ্যে এসেছে বিজেপি। যারা সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখান, তাদের দল গুলির ভাষায় কথা বলে। এই প্রতারণা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হওয়া উচিৎ। বাম সাংসদ ও আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘যে বাংলা নবজাগরণের পথপ্রদর্শক, সেই রাজ্যে এই স্লোগান অকল্পনীয়। চরম দক্ষিণপন্থী ধ্যানধারণায় পুষ্ট যারা তারাই এই মাফিয়া সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চান।’ বিকাশরঞ্জনের মতে, বাংলার রাজনীতি বহু চাপানউতোর দেখেছে। সেখানেও দেওয়াল লিখন বা স্লোগানে রুচি ও কৃষ্টির নিদর্শন মেলে। এভাবে প্রকাশ্যে গুলি মারার লাইসেন্স ঠাঁই পায়নি সেখানে। বাংলায় অন্ধকার যুগ যারা নিয়ে আসতে চান তাঁদের ক্ষমা নেই, জানান বিকাশ।প্রশ্ন উঠেছে ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি বিনোদনের জগতে কখনো উঠেছে কী ‘গোলি মারো’-র প্রসঙ্গ? সাহিত্যে না হলেও সিনেমায় উঠেছে তা বহুবার। রামগোপাল ভার্মার আন্ডার ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক ‘সত্য’-তে ছিল ‘গোলি মারো ভেজে মে’র মত গান।

‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’, ‘মির্জাপুর’, ‘জিলা গাজিয়াবাদে’র মত একাধিক সিনেমায় বারবার উঠে এসেছে গুলি মারা ‘ঔদ্ধত্য’। কিন্তু তা সবই উত্তর ভারতীয় গ্রাম্য ও মাফিয়া সংস্কৃতির প্রতিফলন। বাংলার সংস্কৃতি থেকে যার অবস্থান সহস্র যোজন৷ কিন্তু আসন্ন বিধানসভায় ক্ষমতা দখলের রাজনীতির সূত্রে যে গুলির মারার প্ররোচনা, তা বাংলার মাটি কখনই দেখেনি৷ সহনশীলতা, উদার চিন্তাধারা, সুশিক্ষার মার্জিত ও বিনম্র সাংস্কৃতিক বাতাবরণে তা নিতান্ত বেমানান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আলো এবং অন্ধকারের মধ্যে কাকে বেছে নিতে হবে তা ঠিক করতে হবে বাংলার মানুষকেই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগেই।