ইউটিউবে বাংলা ছড়ার ভিডিও বানিয়ে লক্ষপতি প্রসেনজিৎ

98

সুকুমার বাড়ই, রায়গঞ্জ: হ্যারি পটারের যুগে হাট্টিমাটিমেই আলোর দিশা খুঁজে পেলেন রায়গঞ্জের প্রসেনজিৎ সরকার। বাংলা ছড়ার অ্যানিমেটেড ভিডিও তৈরি করে আজ মাসে লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করছেন বছর পঁয়ত্রিশের এই তরুণ। শুধু তাই নয়, কমলাবাড়ির উদয়পুর গ্রামের ছেলে প্রসেনজিৎ তাঁর সংস্থায় ১৫ জনের বেশি যুবককে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দিয়েছেন। বাংলা ছড়া যে এভাবে এতগুলো ছেলের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে, তা স্বপ্নেও ভাবেননি প্রসেনজিৎ।

স্থানীয় চিত্রশিল্পী শ্যামল কর্মকারের কথায়, দিন যত যাচ্ছে, ইংরেজি ভাষা ততই যেন বাংলা ভাষাকে গিলে ফেলতে চাইছে। বাংলা ভাষার ছড়ায় মন বসে না এই প্রজন্মের শিশুদের। অনেক অভিভাবক মনে করেন, বাংলা ছড়া শিখিয়ে কিচ্ছু হবে না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে পুরোনো বাংলা ছড়ার প্রচার ও প্রসার করে আলাদিনের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন প্রসেনজিৎ। আর এই ঘটনা জানাজানি হতেই সকলের নজর কেড়েছেন তিনি। অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যতের রাস্তায় চলতে চলতে প্রসেনজিৎ আলোর দিশা খুঁজে পেয়েছেন বাংলা ছড়ার সমুদ্রেই।

- Advertisement -

রায়গঞ্জের কাছেই উদয়পুর। এই গ্রামেই থাকেন প্রসেনজিৎ। এমবিএ পাস করা প্রসেনজিৎ জীবনে চলার পথে বারবার হোঁচট খেয়েছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেছেন। প্রতিবন্ধকতার আঁধারে  বারবার জীবন-জীবিকার পথও হারিয়েছেন। তবে হাল ছাড়েননি কখনও। প্রতিবন্ধকতা থেকেই খুঁজে নিয়েছেন চলার অন্য পথ। তিনিই এখন সফল ইউটিউবার।

প্রসেনজিৎ সরকার কথায় কথায় জানালেন, এলোমেলো পথ বেয়ে যখন জীবন-জীবিকা ঠিকানাহীন, তখনই হতাশার গহ্বর থেকে  হাতড়াতে হাতড়াতে খুঁজে পাই বাঁচার রসদ। মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ইউটিউবের সঙ্গে একদিন পরিচয়। আর সেখান থেকেই নতুন স্বপ্নের হাতছানি। বাংলা ছড়ার ইউটিউব চ্যানেল বানালাম। নাম দিলাম-খেয়ালখুশি। খেয়ালখুশিতে বাংলা ছড়াকে গানের সুরে শিশুদের কাছে মনোগ্রাহী করার ব্যবস্থা করলাম। দিনরাত এটা নিয়ে মশগুল হয়ে থাকলাম। সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে চেষ্টা করছিলাম। চিত্তাকর্ষক রকমারি গ্রাফিক্সের মিশ্রণে এইসব গানের সুরে ছড়ার অ্যানিমেটেড ভিডিও খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে সাবস্ক্রাইবার। ধীরে ধীরে ইউটিউব থেকে রোজগার হতেও শুরু করে। সেই টাকা দিয়ে বাড়তে থাকে সামর্থ্য।

তবে শুধু এখানেই থেমে থাকেননি প্রসেনজিৎ। নিজে স্বনির্ভর হয়ে আরও ১৫ জনের  জীবিকার ভার নিয়েছেন। কেউ ভিডিওতে সুর দিচ্ছেন। কেউ গ্রাফিক্সের কাজ করছেন। আবার কেউ অ্যানিমেশনের কাজে ডুবে। ইউটিউবে লাখ পেরিয়ে বেড়ে চলেছে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা। এখন খেয়ালখুশি বাংলা রাইমসের  সাবস্ক্রাইবারের  সংখ্যা চোদ্দো  লক্ষ পঞ্চাশ হাজারের মতো। আর এ থেকে প্রতিমাসে লক্ষাধিক টাকা আসছে ঘরে। প্রসেনজিৎ ও তাঁর বন্ধু আর্ট কলেজের পড়ুয়া উৎপল ভদ্র বাংলা ছড়াকে আজ জনপ্রিয়তার শীর্ষে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একাজে বোন পিয়ালি সরকার ও বন্ধু কৃষ্ণেন্দু বর্মনের সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করলেন প্রসেনজিৎ। বাংলা ছড়া বেচে যে এত রোজগার হয়, তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।

খেতে বসে খেয়ালখুশির ছড়ার ভিডিও দেখতেই হবে। না হলে খাবারের গরাস মুখে তুলবে না সুস্মিতা  সরকারের ছোট্ট মেয়ে। রায়গঞ্জের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক অরিত্র সরকারের স্ত্রী সুস্মিতার কথায়,সুর মেশানো ছড়াগুলোতে যেন একটা জাদু আছে। ছড়াগুলো আমাদের মনকে এখনও নাড়া দেয়। গ্রাফিক্সযুক্ত অ্যানিমেটেড এই ছড়ার ভিডিওতে যে সুর ব্যবহার করা হয়, তা বাচ্চাদের মনোগ্রাহী। তাই সময়ে সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মনের ভাব পালটেছে। আমার মেয়েরা টিভিতে বা মোবাইলে এধরনের  অ্যানিমেটেড ভিডিও না দেখলে খায়ই না।

উদয়পুরের প্রিয়াংকা মণ্ডলও তাঁর ছোট্ট ছেলে শ্রেয়াংশকে খেয়ালখুশির বাংলা ছড়া দেখিয়ে দেখিয়ে খাওয়ান। তাঁর কথায়,সেই হাট্টিমাটিম টিম, চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে, বাবুরাম সাপুড়ে, আগডুম বাগডুম, ভোর হলো দোর খোলো, নোটন নোটন পায়রাগুলো- ছড়াগুলো বাচ্চাকে দেখাতে দেখাতে নিজেদেরও বেশ ভালো লেগে যায়। গ্রামের বাসিন্দা আশিস করের কথায়,সাম্প্রতিক নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোনো ঐতিহ্যমাখা বাংলা ছড়াকে মিলিয়ে মিশিয়ে নতুন রূপে শিশুদের সামনে হাজির করছেন প্রসেনজিৎ ও তাঁর দল। ও যে আমাদেরই এই এলাকার ছেলে, জেনে ভীষণ ভালো লাগছে।