দিব্যেন্দু সিনহা  জলপাইগুড়ি : টুকটাক অভিযোগ উঠলেও, প্রশাসন জলপাইগুড়ি শহরে বিভিন্ন মুখোশের আড়ালে চলা দেহব্যবসা নিয়ে সেভাবে সচেতন হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া পরপর কয়েটি ঘটনার জেরে তারা নড়েচড়ে বসেছে। গত কয়েক মাসে পরপর অভিয়ান চালিয়ে কয়েকজন মহিলা ও পুরুষকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

তবে জলপাইগুড়ি শহর ও জেলার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সিংগিং ও ডান্সিং বার এবং হোটেলগুলির একাংশ মানব পাচার, দেহব্যবসা বা এসকর্ট সার্ভিসের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে জলপাইগুড়ির বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মনে করছে। তাদের অভিযোগ, এই বিষয়গুলি নিয়ে রীতিমতো সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন ওয়েসাইটে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এজেন্সির মাধ্যমে এসকর্ট সার্ভিসের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের বিষয়গুলি নিয়ে যতটা তত্পর হওয়া উচিত, তারা ততটা না হওয়ায় এই সিন্ডিকেট ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানার আইসি বিশ্বাশ্রয় সরকার অবশ্য বলেন, সমস্ত হোটেলে এবং বারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একাজে সাদা পোশাকের পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। পুলিশ সুপার অমিতাভ মোদি বলেন, জেলার সমস্ত হোটেল এবং বারের ওপর সাদা পোশাকের পুলিশ নজর রাখছে। সেই সঙ্গে কোন হোটেলে কী ঘটছে, তার খবর নেওয়া হচ্ছে। বেআইনি কিছু নজরে পড়লেই অভিয়ান চালানো হচ্ছে।

জলপাইগুড়ি জেলা সহ ডুয়ার্সে নারী পাচার দীর্ঘদিনের সমস্যা। তবে এখন ডুয়ার্স ও সমতলের বহু এলাকা থেকে মেয়েরা জলপাইগুড়ি শহরের বিভিন্ন হোটেলে এসে দেহব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে যেমন স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা রয়েছে, তেমন গৃহবধূরাও আছেন। অল্প সময়ে চটজলদি টাকা রোজগারের জন্যই এরা এই কাজ করছেন বলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি মনে করছে। তাদের দাবি, হোটেলগুলির কর্মীদের একাংশের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া এভাবে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এমনকি বিভিন্ন ধাবা, রিসর্ট, বিউটি পার্লার ও ম্যাসাজ সেন্টারের আড়ালেও এসকর্ট সার্ভিস কাজ করছে। বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনে এই ব্যবসা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাস্টমার ও যৌনকর্মীদের মধ্যে সংযোগ রক্ষার কাজ করে একশ্রেণির পুরুষ ও মহিলা। এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে দেহব্যবসা করা এক মহিলা জানান, দালালরা তাঁকে কাস্টমার জোগাড় করে দেয়। এর জন্য অবশ্য দালালকে কমিশন দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, জলপাইগুড়ি জেলায় এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে বহু মেয়ে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বহু গৃহবধূও এই কাজ করে ভালো টাকা উপার্জন করেছে। সম্প্রতি জলপাইগুড়ির একটি হোটেলে হানা দিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সেখানে কোচবিহারের হলদিবাড়ির এক মহিলাও ছিলেন। এর আগে ধরম পাসোয়ানের পানশালা ঘিরে মানব পাচার ও দেহব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। এমন কাজ রুখতে কড়া পদক্ষেপ করুক প্রশাসন, চাইছে নাগরিকদের একাংশ।

সেন্টার ফর হিউম্যান ট্রাফিকিং রিসার্চের অধিকর্তা সিদ্ধার্থ সরকার মনে করেন, এই ধরনের বারগুলি মানব পাচারের জন্য অনেক অংশেই দায়ী। তিনি বলেন, আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের মেয়েছের টার্গেট করে তাকে ফুঁসলে অপরিচিত শহরে নিয়ে আসা হয়। পরে জোর এসকর্ট সার্ভিসে যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ওই মেয়েটি পাচারচক্রের অংশ হয়ে দালালের কাজ করে। এই ভাবেই নেটওয়ার্ক তৈরি করে কমবয়সি মেয়েদের বিভিন্ন বারে নাচ-গান করার চাকরি দেওয়ার নামে নিয়ে এসে দেহব্যবসার কাজে নামানো হয়। পুরো বিষয়টি সিন্ডিকেটরাজ ছাড়া চালানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে উইমেন্স ইনটারলিংক ফাউন্ডেশনের কোঅর্ডিনেটর শিখা মিত্র এ প্রসঙ্গে বলেন, ডান্সিং বারের আড়ালে দেহব্যবসা চালানোর বিষয়টি নতুন নয়। বড়ো শহরগুলির মতো জলপাইগুড়িতেও এখন এটা শুরু হয়েছে। হোটেলের পাশাপাশি ধাবা ও বিউটি পার্লারগুলিতেও একাজ হচ্ছে।