পূজাই এখন এলাকার প্রেরণা

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : দুবছর বয়সেই দুই পা ট্রেনের চাকায় পিষে গিয়েছিল। কৃত্রিম পা লাগানোর পর সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় দুই পায়ের অবশিষ্ট অংশ ঘষড়ে ঘষড়েই তিনি জীবনযুদ্ধের পথচলা শুরু করেন। পরিবারে আর্থিক কষ্টের পাশাপাশি নিজের এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য সমাজের বহু মানুষের কাছে তিরস্কার, গঞ্জনা থেকে হাসির খোরাক হযে উঠলেও নিজের পা-এ দাঁড়ানোর জেদ থেকে কখনোই সরে আসেননি। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের  বিবেকানন্দনগরের বাসিন্দা পূজা গুপ্তা বর্তমানে বিএড পড়ার পাশাপাশি ডঃ রাজেন্দপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের পার্টটাইম শিক্ষিকা। এখন শুধু স্কুল পড়ুয়াদের কাছেই নয়, নিজের এলাকার পিছিয়ে পড়া শিশু, কিশোরদের কাছেও অনুপ্রেরণার মুখ হয়ে উঠেছেন।

রেললাইন সংলগ্ন বিবেকানন্দনগরের বাসিন্দা পূজার পরিবারে মা, বাবা ছাড়াও রয়েছেন দুই দাদা ও এক দিদি। সংসার চালানোর মাধ্যম বলতে ছিল বাবার ফলের ঠেলাগাড়ি ও বাড়ির মধ্যেই মায়ের ছোটো মুদিখানার দোকান। সংসারে আর্থিক অনটন চলার মাঝেই নতুন করে ঝড় নিয়ে আসে ২৫ বছর আগের একটি ঘটনা। বছর দুয়েকের পূজার পায়ে উপর দিয়ে ট্রেন চলে যায়। বেঁচে গেলেও পা কাটা পড়ে পূজার। টাকা জোগাড় করে কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করা হলেও সেই পা লাগানোর পর নতুন করে ইনফেকশন দেখা দেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন পূজার মা বীণা গুপ্তা। পায়ের অবশিষ্ট অংশ ঘষড়েই পূজার চলাফেরা শুরু হয়।

- Advertisement -

বাড়িতে কিছুটা পড়াশোনা শেখানোর পর পাঁচ বছর বয়সে পূজাকে স্কুলে ভরতি করাতে যান বীণাদেবী। কিন্তু স্কুলগুলো পূজার এই অবস্থা দেখে ভরতি নিতে অস্বীকার করে। অবশেষে বীণাদেবী লিখিত আকারে স্কুলে মেয়ের কোনো বিপদ হলে তাঁর দায় নিজের ঘাড়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের প্রাইমারি বিভাগ পূজাকে ভরতি নেয়। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পরপর পূজা হাসির  খোরাক হয়ে ওঠে। ফলে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। বীণাদেবী পূজাকে বুঝিয়ে বলেন, কেউ কিছু বললে তার উত্তর না দিয়ে ফিরে আসবি না।

মায়ের এই উপদেশের জোরেই পূজা ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর হিন্দিতে অনার্স নিয়ে শিলিগুড়ি কলেজ থেকে স্নাতক হন। সরকারি সাহায্য না পাওয়ায় টিউশন করার টাকা দিয়ে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। বর্তমানে বিএড পড়ার পাশাপাশি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলে হিন্দিতে পার্টটাইম শিক্ষকতা করেন। এই পথ যে সহজ ছিল না তা পূজার কথায় বোঝা যায়। পূজা বলেন, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রতিদিন বাসে যাওয়ার সময় অনেকদিন বসার জায়গা পেতাম না। খুব কষ্ট হত। যখনই কেউ আমাকে নিয়ে হাসত মায়ে কথাই মনে করতাম।

চাকরির ইনটারভিউ দিতে গিয়েও ব্যাঙ্গের মুখে পড়েন পূজা। তাঁর কথায়, একবার একটি কলসেন্টারে গিয়েছিলাম। ইনটারভিউ দেওয়ার পর ওঁরা জানিয়েছিলেন আমার মত মেয়ের জন্য ওঁদের কাছে মডার্ন বাথরুম নেই। আমার পা না থাকার বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করে এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে হাসির খোরাক করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে পূজাকে পেয়ে খুশি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সঞ্চিতা দেব। তিনি বলেন, পূজা যেদিন প্রথম ইনটারভিউ দিতে এসেছিল সেদিন থেকেই ও আমাদের অনুপ্রাণিত করতে শুরু করেছে। আমাদের স্কুল থেকে পাস করা এই মেয়েটি নতুন প্রজন্মকে পড়ানোর মাধ্যমে শুধু জ্ঞান প্রদান করছে এমন নয়, আমাদের সকলের কাছে ও এখন অনুপ্রেরণা।