নরবলির স্বপ্নাদেশে স্থান বদলায় পুজোর

দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : পুজো করলেই দিতে হবে নরবলি। দেবীর এমন স্বপ্নাদেশ পেতেই বামুহা ভবানীতলায় পুজো বন্ধ করে দেন উদ্যোক্তারা। বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকে ওই পুজো। তারপর আবার গ্রামের হাটখোলায় শুরু হয়েছে এই পুজো। এই পুজো ঘিরে এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অনেক কাহিনি।

১৯৬২ সালে বামু্হা স্কুলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ভবানীতলায় বামুহা তপশিলি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে এলাকার বাসিন্দারা প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। কথিত আছে, প্রথম বছরই পুজো চলাকালীন কমিটির এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পান, এখানে পুজো করলেই দিতে হবে নরবলি। এরপরেই সেই পুজো বন্ধ করে দেন গ্রামবাসীরা। তবে দুর্গাপুজো বন্ধ হলেও স্কুল চত্বরের বাইরে থেকে যায় ভবানীদেবীর বেদি। ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ঘেরা এই বেদি। বেশ কয়েক বছর পুজো বন্ধ থাকার পর গ্রামবাসীরা স্থান পরিবর্তন করে এই পুজো বামুহা হাটখোলায় নিয়ে যান।

- Advertisement -

পুজোর স্থান পরিবর্তন হলেও প্রতিবছর ভবানীতলায় ভবানীদেবীর বেদিতে পুজো দেওয়ার পর হাটখোলার মন্দিরে দুর্গাপুজো শুরু হয়। গ্রামের যে কোনো শুভ অনুষ্ঠান বা পুজো হলেও আগে এই বেদিতে ফুল, বেলপাতা, ভোগ দিয়ে পুজো দেওয়ার পরই বাড়ির পুজো করেন গ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ভবানীদেবীর বেদি খুব জাগ্রত। এখানে পুজো দিলে সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং প্রত্যেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়। তাই বেদির আশেপাশে থাকা কোনো গাছের একটি পাতাও ছুঁয়ে দেখে না বামুহা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।

রায়গঞ্জ ব্লকের শেরপুর অঞ্চলের বামুহা গ্রামের ভবানীতলার বাসিন্দারা এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই এখানে সারা বছর পুজো করে থাকেন। শেরপুর অঞ্চলের প্রধানের স্বামী ভানুরাম বর্মন জানান, কথিত আছে ভবানীতলার পুজোয় নরবলির স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরের বছর থেকেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ভবানীতলা খুব জাগ্রত। গ্রামের যে কোনো অনুষ্ঠান বা পুজো হলেই গ্রামবাসীরা আগে ওখানে পুজো দিয়ে আসেন। বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর প্রায় ২৫ বছর হল সেখানকার পুজো হাটখোলায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভবানীতলার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সুশান্ত দেবশর্মা জানান, ভবানীতলায় প্রথমবার পুজো করার পরেই সেই পুজো বামু্হা হাটখোলায় সরিয়ে নিয়ে আসা হয়।

হাটখোলার মন্দিরে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজো শুরু করার আগে ভবানীতলার বেদিকে পুজো করি আমরা। শুধু তাই নয়, বিসর্জন দেওয়ার আগে দেবী দুর্গাকে এই বেদির সামনে নিয়ে এসে মা ভবানীকে দেখিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এটাই বামুহা গ্রামের সর্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রচলিত রীতি ও নিয়ম। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, এখানে পুজো না দিলে কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। গ্রামের হিন্দু ও মুসলিম, দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ভবানীতলার বেদিকে খুব জাগ্রত মনে করেন। বামুহা গ্রামের প্রবীণ গণেশ দেবশর্মা, লগেন দেবশর্মা,

সুচিত্রা হালদার, অশোক পালরা জানান, ভবানীতলায় একবার দুর্গাপুজো হওয়ার পর এখানে আর পুজো হয়নি। ২৯ বছর হল হাটখোলায় পুজো হচ্ছে। এখানে পুজো চলাকালীন এক গ্রামবাসী নরবলির স্বপ্নাদেশ পান। এখানে পুজো দিলে নরবলি দিতে হবে, এমন স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরেই এখানে পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে গ্রামের যে কোনো পুজো হলে আগে গ্রামবাসীরা এই বেদিতে পুজো দিয়ে আসেন। ভবানীতলা জঙ্গলাকীর্ণ হলেও কেউ সেখানে গাছপালা কাটতে পারে না। দেবী ভবানীর বেদি ঘিরে বিশ্বাস আর ভয় আজও রয়ে গিয়েছে বামুহা গ্রামের মানুষের মনে। গ্রামের মানুষ এই বিশ্বাসে ভর করেই দুর্গাপুজো এগিয়ে নিয়ে চলেছে।