জল শুকিয়ে পুনর্ভবা নদী এখন খেলার মাঠ

124

বিপ্লব হালদার, গঙ্গারামপুর : বর্ষার মরশুম ফুরাইলে বিপুলা পদ্মা কৃপণ হয়ে যায়। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের লাইন আজ গঙ্গারামপুরের পুনর্ভবা নদীর সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যায়। দূর থেকে দেখলে চোখে পড়বে দুদিকে বিস্তীর্ণ ঘাস, মাঝে ছিপছিপে জল। মনে হতেই পারে বৃষ্টির জল জমে রয়েছে। কিন্তু এটাই পুনর্ভবা। হ্যাঁ শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। একসময় এই নদী জলে ভরে থাকত। পিয়ালি-তিনকাটা মাছ দুহাত ভরে বিক্রি করেছেন মৎস্যজীবীরা। আজ সেই নদীতে মাছ তো দূরস্থান, নেই জল পর্যন্ত। পুনর্ভবায় জল না থাকায় বাধ্য হয়ে জীবিকা বদলে ফেলছেন গঙ্গারামপুরের সুবল, যুগল সরকাররা।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম নদী পুনর্ভবা। এক সময় নদীতে চলত বজরা। জাল ফেললেই মিলত বোয়াল, আড়, রুই, কাতলা, চিতল, ট্যাংরা, চিংড়ি, পাবদা, রাইখোর। চৈত্র মাসে শুধু পিয়ালি ও তিনকাটা মাছ বিক্রি করে দিব্যি সংসার চলে যেত এলাকার মৎস্যজীবীদের। কিন্তু পুনর্ভবার সেই দিন আজ গঙ্গারামপুরের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সোনালি অতীত। বর্ষার কয়েক মাস নদীতে জল থাকলেও চৈত্রের দাবদহে পুনর্ভবায় জল নেই। গঙ্গারামপুরের শিববাড়ি, ইন্দ্রনারায়ণপুর কলোনি, গোয়াল খাঁড়ি এলাকায় কিছুটা জল থাকলেও বেশির এলাকার ঘাটগুলি এখন কচিকাঁচাদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। যে সমস্ত জায়গায় জল রয়েছে পিয়ালির দেখা নেই বললেই চলে। আর এতে গঙ্গারামপুরের মৎস্যজীবীরা সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছেন। নদী থেকে মাছ না মেলায় অনেকেই বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন।

- Advertisement -

এবিষয়ে গঙ্গারামপুরের প্রবীণ মৎস্যজীবী গোপাল হালদার বলেন, কিছু বছর আগেই পুনর্ভবাতে সারা মাস জল থাকত। নৌকায় চড়ে ঘুরে ঘুরে মাছ ধরেছি। চৈত্র মাসে পিয়ালি, তিনকাটা মাছ তো পেতামই।  কিন্তু এখন পিয়ালি মাছও পাওয়া তো দূরের কথা, বেশিরভাগ ঘাটই শুকিয়ে গিয়েছে। যে সমস্ত ঘাটে জল আছে, সেখানে মাছ নেই। কী দিয়ে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।

পুনর্ভবা থেকেই মাছ ধরে একসময় ছেলেমেয়েছের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেই পুনর্ভবা আজ শুকিয়ে যাওয়ায় মনভার মৎস্যজীবী যুগল সরকারের। তিনি বলেন,  সেদিনের নদী দেখলে জলে নামতে ভয় লাগত। কিন্তু সেই নদীর জল আজ কোথায়!

মৎস্যজীবী সুবল  সরকার বলেন, পুনর্ভবা থেকে একসময় বোয়াল, পাবদা, রাইখোর, চিতল মাছ ধরেছি। সেই মাছ ভালো দামে বিক্রি করেছি। তা দিয়ে অনায়াসে সংসার চলে যাচ্ছিল। চৈত্র মাসেও বিভিন্ন ঘাটগুলিতে প্রায় ১০-১২ হাত জল থাকত। কিন্তু কয়েকবছর ধরে আর জল থাকে না। জল না থাকায় মাছ ধরা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন কী  করে সংসার চালাব, সেই চিন্তায় দিন কাটছে।

মৎস্যজীবী রতন হালদার বলেন, পুনর্ভবা মানেই পিয়ালি ও তিনকাটা মাছ। চৈত্র মাসে এই দুই মাছ ধরেই আমাদের সংসার চলত। কিন্ত সেই নদীর জল আজ এতটা শুকিয়ে যাবে ভাবতে পারছি না। মাছ ধরে সংসার চালাবার সমস্ত রাস্তা আজ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের টোটো, ভ্যান চালাতে হচ্ছে।