পুনর্ভবা যেন চষা খেত, বিপাকে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা

82

রাজু হালদার, গঙ্গারামপুর : দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন চষা খেত। যে দিকে তাকাও ফাঁকা প্রান্তর। তার মধ্যে মরীচিকার মতো ক্ষীণধারায় জলের রেখা। বললে হয়তো কেউই বিশ্বাস করবেন না, এটাই পুনর্ভবা। হ্যাঁ, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার লাইফলাইন পুনর্ভবা নদীর জল শুকিয়ে বর্তমানে  মৃতপ্রায় দশা। যেভাবে জল শুকোতে শুরু করেছে, তাতে এখনই উদ্যোগ না নিলে জেলার মানচিত্র থেকে মুছে যাবে পুনর্ভবা, এমনই আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। তাঁদের দাবি, সরকার পাশে না দাঁড়ালে মৎস্যজীবী ও কৃষকরাও রুজিরোজগার হারাবেন।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী পুনর্ভবা। একসময় সারাবছরই জলে পরিপূর্ণ থাকত। নানান ধরনের সুস্বাদু নদীয়ালি মাছের উৎসস্থল ছিল পুনর্ভবা। এই নদীকে ঘিরে মৎস্যজীবীরা জীবিকানির্বাহ করতেন। পাশাপাশি কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও প্রধান সহায় ছিল এই নদীই। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পুনর্ভবা নদীতে অদ্ভুতভাবে জল কমতে শুরু করেছে। সারা বছরের মধ্যে শুধু বর্ষার মরশুমে জল থাকছে। জল কম যাওয়ায় বিপাকে এলাকার মৎস্যজীবী ও চাষিরা। আশঙ্কার ভাঁজ পরিবেশবিদদের কপালেও।

- Advertisement -

এ প্রসঙ্গে পুনর্ভবা পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সভাপতি দিব্যেন্দু সরকার জানান, গঙ্গারামপুর শহর ও তার আশেপাশের গ্রামের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের মূল ভিত্তি ছিল পুনর্ভবা। তখন সারাবছর নদীতে জল থাকত। কতরকম রকমের সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত। মাছ বিক্রি করেই মৎস্যজীবীদের সংসার চলছিল। পুনর্ভবার জল পেয়ে গঙ্গারামপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার চাষি উপকৃত হয়েছেন। কিন্তু এখন বছরের নয় মাসই নদীতে জল থাকে না। জেলেরা কাজ হারিয়েছেন। অনেকেই বাঁচার তাগিদে অন্য পেশা গ্রহণ করেছেন। নদী এখন শুধু আবর্জনা ফেলা ডাস্টবিন হয়ে উঠেছে। এই নদীকে বাঁচাতে দিব্যেন্দুবাবুর মতো পরিবেশপ্রেমীরা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। তবে নবনির্বাচিত সরকার এবারে দক্ষিণ দিনাজপুরের এই নদীকে নিয়ে আগামীদিনে চিন্তাভাবনা করবেন বলে আশাবাদী দিব্যেন্দুবাবু।

কিন্তু সারা বছর জলে পুষ্ট পুনর্ভবায় কি করে জল শুকিয়ে যাচ্ছে? পরিবেশবিদদের বক্তব্য, সীমান্তে বাংলাদেশ সরকার অবৈধভাবে রাবার ড্যাম তৈরি করে জল নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে পুনর্ভবা নদী ক্রমশ জলশূন্য হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ফলে পুনর্ভবা নদীর জল শুকিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম লাইফলাইন পুনর্ভবা নদীকে বাঁচাতে নবনির্বাচিত সরকারকে উদ্যোগী হতে আবেদন জানালেন পরিবেশপ্রেমীরা।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশপ্রেমী তুহিনশুভ্র মণ্ডল জানান, দক্ষিণ দিনাজপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী প্রশাসনিক উদাসীনতায় হারিয়ে যেতে বসেছে। পুনর্ভবার জল আজ তলানিতে। বাংলাদেশ পুনর্ভবা নদীতে রাবার ড্যাম বসিয়ে জল নিয়ন্ত্রণ করছে। পুনর্ভবা জলশূন্য হয়ে পড়েছে। জেলার মৎস্যবৈচিত্র‌্যও নষ্ট হতে বসেছে। যা পরিস্থিতি এখনই ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে পুনর্ভবা। কিন্তু কীভাবে এই সমস্যা থেকে বেরোনো যায়। তুহিনবাবুর মত, ইতিপূর্বে আত্রেয়ী নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিষয়টি কেন্দ্র এবং রাজ্যের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সেইমতো পুনর্ভবাকে নিয়ে আরও দীর্ঘ আন্দোলনের প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পঞ্চায়ে দপ্তরকে দ্রুত নদী সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। পুনর্ভবাকে বাঁচাতে সদ্য নবনির্বাচিত সরকারের কাছে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন রইল।

পুনর্ভবা নদীকে বাঁচাতে নবনির্বাচিত সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন সুবোধ দে জানান, পুনর্ভবা নদীকে কেন্দ্র করে বহু জীবন-জীবিকার পাশাপাশি সমৃদ্ধ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এই নদীর সঙ্গে গঙ্গারামপুর শহর সহ  দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে। অতীতের প্রাণবন্ত এই নদী আজ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। পুনর্ভবাকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিভিন্ন পরিবেশপ্রেমী সংগঠন পরিশ্রম করে চলেছে। তাই নবনির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, তারা যেন পুনর্ভবা নদীকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। সেইসঙ্গে এই নদীকে পুনর্জীবিত করতে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবার  আবেদন রইল।