ডোজের ফারাকে কোভিশিল্ডে সংশয়ের মেঘ

279

নিউজ ব্যুরো : করোনা প্রতিষেধক হিসাবে কোভিশিল্ড টিকাকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করেন দেশের অধিকাংশ নাগরিক। অন্য সংস্থার তৈরি টিকা সম্পর্কে দেশবাসীর একাংশে এখনও কিছু কিন্তু কিন্তু ভাব আছে। অথচ কোভিশিল্ডের দুই ডোজ গ্রহণের মাঝখানের সময়সীমা কেন্দ্রীয় সরকার বাড়িয়ে দেওয়ায় এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশই কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। তাঁদের কারও কারও মতে, দুই ডোজের ফারাকের সময়সীমা বাড়িয়ে ১২-১৬ সপ্তাহ করার পিছনে তেমন জোরালো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং দুই ডোজের মাঝের সময় বেশি হলে সেই সময় সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাছাড়া এই সময় সংক্রামিতের দেহে ভাইরাসের চরিত্র বদলের বিপদও তৈরি হয়।

- Advertisement -

স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান শান্তনু ত্রিপাঠী বলেন, আমাদের দেশ সবকিছুতে দেরিতে চলে বলে এই সমস্যা। তিনি জানান, ব্রিটেনেও কোভিশিল্ডের দুই ডোজের মাঝের সময়সীমা বদল হয়েছে। ওই দেশে গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে টিকাকরণ শুরু হওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় ডোজের সময় নির্ধারিত ছিল। ততদিনে ওই দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ চলে আসায় যত বেশি সংখ্যক লোককে টিকাকরণের আওতায় আনার জন্য ঠিক হয়, অন্তত একটি ডোজ সবাইকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এই তাড়নায় দুই ডোজের ফারাক ৪-৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ব্রিটেন তখন ৮-১২ সপ্তাহ করেছিল। অধ্যাপক ত্রিপাঠী বলেন, সেই কারণে আমাদের দেশও তখন ব্রিটেনকে অনুসরণ করে। কিন্তু আমরা সবেতেই দেরি করি। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ওরা যখন ৮-১২ সপ্তাহ করল, তখন আমরা সবে ৬-৮ সপ্তাহের ফারাকে টিকা দিতে থাকলাম। আমরা যখন ৮-১২ সপ্তাহ করলাম, ততদিনে ব্রিটেন কিন্তু আবার পিছু হেঁটেছে।

এর কারণ হিসাবে স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের এই প্রাক্তন অধ্যাপকের বক্তব্য, ব্রিটেনের পিছু হটার কারণ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট। ব্রিটেন বুঝল, প্রথম ডোজের পর কাউকে এতদিন অরক্ষিত থাকা যাবে না। এই ভ্যারিয়েন্টই কিন্তু ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এনেছে। তাই ব্রিটেনের পিছু হটার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ডোজের ফারাক কমানো উচিত ছিল।

এই অরক্ষিত না রাখার পক্ষে যুক্তি হল, প্রথম ডোজ নেওয়ার পরেও সংক্রামিত হওয়ার তথ্য। উত্তরবঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তর এ ব্যাপারে স্পষ্ট পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও জানিয়েছে, দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পরেও শুধু সংক্রমণ নয়, কারও কারও মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। ফলে প্রথম ডোজের পর ঝুঁকি তো আরও বেশিই থাকে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের ভিআরডিএল সায়েন্টিস্ট শান্তনু হাজরা বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে সব দেশে গবেষণা চলছে। কোভিশিল্ড নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য আসছে। তবে গবেষকরা মনে করেছেন বলেই তো দুই ডোজের ব্যবধান বাড়ানো হয়েছে।

একই মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজির বিভাগীয় প্রধান অরুণাভ সরকার অবশ্য বলেন, কোভিশিল্ড প্রথমে কোভ্যাকসিনের মতোই ২৮ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, সেক্ষেত্রে কোনও অ্যান্টিবডিই তৈরি হয় না। পরে ব্যবধান বাড়িয়ে দুমাস করা হয়। তাতেও অ্যান্টিবডি সেভাবে তৈরি না হওয়া বর্তমানে ব্যবধান বাড়িয়ে তিন মাস করা হয়েছে।

কিন্তু স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রাক্তন অধ্যাপক শান্তনু ত্রিপাঠী মনে করেন, এখনই আবার কোভিশিল্ডের দুই ডোজের ফারাক কমানো দরকার। নাহলে মানুষ বিপন্ন হবে।  সরকার এই আশঙ্কা মানতে এতদিন রাজি ছিল না। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন ইতিপূর্বে টুইটে লিখেছিলেন, বিজ্ঞানসম্মত পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে স্বচ্ছতার সঙ্গে কোভিশিল্ডের দুই ডোজের মাঝের সময়ে ফারাক বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন অভিমতে সোচ্চার হতে শুরু করায় খানিকটা হলেও এখন অবশ্য সরকারি অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল টেকনিকাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ অফ ইন্ডিয়ার ইমিউনাইজেশন অ্যাডভাইজারি বোর্ডের চেয়ারম্যান এনকে অরোরা সম্প্রতি বলেছেন, তথ্যের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কোভিড ও টিকাকরণের পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। তবে কোভিশিল্ডের দুই ডোজের মাঝের সময়সীমা ৪-৮ থেকে বাড়িয়ে ১২-১৬ সপ্তাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিজ্ঞানসম্মতভাবেই।

এর পরেই কিছুটা পিছু হটে অরোরা বলেন, কাল যদি আমাদের দেশে টিকাকরণের নীতিনির্ধারক সংস্থা মনে করে মানুষের ভালোর জন্য দুই ডোজের ফারাক কমানো দরকার, তাহলে পর্যালোচনার ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে যদি দেখা যায়, বর্তমান সিদ্ধান্তই সঠিক, তবে কোভিশিল্ডের টিকাকরণে বর্তমান পদ্ধতিই চলবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের অবশ্য বক্তব্য, সরকার যাই দাবি করুক, দুই ডোজের মাঝের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনও তথ্য বা গবেষণা সরকার সামনে আনতে পারেনি। বিশিষ্ট মহামারি বিশেষজ্ঞ গিরিধারা বাবুর মতে, ভারতের মতো দেশে কোভিশিল্ড টিকার দুই ডোজের মাঝের ফারাক ৪-৮ সপ্তাহ রাখা সবচেয়ে ভালো ও বিজ্ঞানসম্মত।

তিনি বলেন, ৪-৮ সপ্তাহের ফারাক করোনা ভাইরাসের বর্তমান ও নতুন করে দেখা দেওয়া ডেলটা প্রজাতির মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ব্রিটেন ইতিমধ্যে কোভিশিল্ডের দুই ডোজের মাঝের সময়সীমাকে আবার ৮ সপ্তাহের মধ্যে এনে ফেলেছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে আচমকা মে মাসে এই ফারাক ১৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার পিছনে অন্য কারণ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নয়াদিল্লিতে গত ১২ মে একটি টিকাকরণ কেন্দ্রের বাইরে টিকা নেই বলে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়ার পরদিনই কেন্দ্রীয় সরকার কোভিশিল্ডের দুই ডোজের মাঝের ফারাক বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত করার পিছনে কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। কিন্তু ১৬ সপ্তাহ করার জন্য কোনও গবেষণালব্ধ কারণ নেই।