জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ি জেলার পাশাপাশি শহরেও ডেঙ্গু ও অন্য রোগের দাপট ক্রমেই বাড়ছে। অথচ জেলার সদরই দূষণ ও জঞ্জালের আঁতুড়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে অভিযোগ উঠছে, পুর কর্তৃপক্ষ শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছে না, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের একাংশের অসচেতনতার জন্য মশার বংশবৃদ্ধির এলাকা বাড়ছে। বাসিন্দাদের বক্তব্য, পুর কর্তৃপক্ষ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও শুয়োর ধরার অভিয়ান ঠিকভাবে হচ্ছে না। শহরের বিভিন্ন পাড়ার আবর্জনাও সময়ে সাফ করা হচ্ছে না। করলা নদীর দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়নি। এমনকি ঠিকভাবে সাফ না করায় শহরের নিকাশির অন্যতম প্রধান মাধ্যম গদাধর ক্যানালে বিভিন্ন বর্জ্য জমা হয়ে থাকছে। দূষণের জেরে ওই এলাকা থেকে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। যদিও প্রশাসনের তরফে বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

শহরে শুয়োরের দাপট

জলপাইগুড়ি শহরকে শুয়োরমুক্ত করা নিয়ে পুর কর্তৃপক্ষ বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্ত গত কয়েকবছরে অভিযানের দিন ঘোষণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সম্প্রতি একদিনের অভিযানে ২টি শুয়োর ধরা পড়েছে। পরে আর অভিযান হয়নি। এই অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পারিষদ (জল) সৈকত চট্টোপাধ্যায়ের নির্বাচনি কেন্দ্র ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা শুযোরের উৎপাতে ক্ষুব্ধ। শহরের পান্ডাপাড়া, মাহামায়াপাড়া, জয়ন্তীপাড়া, কদমতলা, আনন্দপাড়া, নিউটাউনপাড়া, পবিত্রপাড়া, হাসপাতালপাড়া, দিনবাজার, স্টেশনবাজার সহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে শুয়োর ঘোরে। অভিযোগ, পুরসভার একশ্রেণির কর্মী বেআইনিভাবে শুয়োর প্রতিপালন করছেন। আবার শহরের কিছু ব্যবসায়ী এই শুয়োর প্রতিপালনের জন্য মোটা টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তাই পুর কর্তৃপক্ষ মুখে বললেও শুয়োর ধরার অভিযান নিয়ে তেমন উৎসাহী নয় বলে বাসিন্দাদের দাবি।

থার্মোকল থেকে করলায় দূষণ

জলপাইগুড়ি শহরের লাইফলাইন করলা নদী বর্তমানে মশার আঁতুড়ে পরিণত হয়েছে। এই নদীকে দূষণমুক্ত করার বিষয়ে বিভিন্ন পরিবেশপ্রেমী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সরব হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। শহরের দিনবাজার এলাকায় একশ্রেণির মৎস্য ব্যবসায়ী নদীতে থার্মোকলের বাক্স ফেলছেন। যার ফলে নদীর বহনক্ষমতা কমছে। নদীতে জল জমে থাকার সুযোগে মশার বংশবৃদ্ধি হচ্ছে। নদীর মধ্যে বাজারের আবর্জনা ফেলা হলেও প্রশাসনের নজরদারি নেই বলেই অভিযোগ। জলপাইগুড়ি মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক বিশ্বজিৎ মিত্র বলেন, এক শ্রেণির মৎস্য ব্যবসায়ী বেআইনিভাবে নদীতে থার্মোকলের বাক্স ফেলছে। এটা একেবারেই অন্যায়। যারা এই বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হোক।

পাড়া ও বাজারের জঞ্জাল

জলপাইগুড়ি শহরের ২৫টি ওয়ার্ডেই সময়মতো আবর্জনা সাফ না করার অভিযোগ উঠেছে। বাসিন্দাদের বক্তব্য, সাফাইকর্মীরা অনেক দেরিতে জঞ্জাল সংগ্রহ করতে আসেন। পাশাপাশি জঞ্জাল সংগ্রহের গাড়িগুলি ঠিকভাবে ঢাকা না দেওয়ায় তা থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি, শহরের অন্যতম বড়ো দুটি বাজার দিনবাজার ও স্টেশন বাজারের আবর্জনাও ঠিকভাবে সাফ না করার ফলে এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এছাড়া বাজারগুলিতেও শুয়োরের উপদ্রব রয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাধন বসু বলেন, জলপাইগুড়ি শহরে করলার দূষণ এবং বেআইনিভাবে শুয়োর বিচরণের ফলে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পুরসভা এবং সাধারণ প্রশাসনকে যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

নাগরিকদের ক্ষোভ বাড়ছে

জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সম্পাদক রাজা রাউত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শহরের দূষণ এবং শুয়োর উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি। অন্যদিকে কংগ্রেসের জেলা সভাপতি নির্মল ঘোষদস্তিদার বলেন, শহরে প্রতিদিন দূষণের মাত্রা বাড়ছে। প্রশাসন এখন পদক্ষেপ না করলে এরপর পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। একইসুরে সিপিএমের জেলা সম্পাদক সলিল আচার্য বলেন, পুরসভা সর্বক্ষেত্রেই ব্যর্থ। দূষণ নিয়ে পুর কর্তৃপক্ষ ছেলেখেলা করছে। জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী বলেন, দূষণ নিয়ে সকলে যখন সক্রিয়, তখন জলপাইগুড়ি পুরসভা নিষ্ক্রিয়। জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের সুপার ডাঃ গয়ানাথ নস্কর হাসপাতাল চত্বরে শুয়োরের উপদ্রবের কথা উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার জন্য পুর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন।

পুর কর্তৃপক্ষের কথা

জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান পারিষদ (জল) সৈকত চট্টোপাধ্যায় বলেন, পুরসভা হালে তিনদিন ধরে শুয়োর ধরবার অভিযান করেছে। ১১টি বেআইনি শুয়োর বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে বেআইনি শুয়োর ধরবার অভিযান চালানো হবে। অন্যদিকে চেয়ারম্যান পারিষদ (পূর্ত) সন্দীপ মাহাতো বলেন, করলার দূষণ রোধের জন্য পুর কর্তৃপক্ষ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। করলা বড়ো নদী। এই নদীর দূষণ রোধের জন্য যে টাকা প্রয়োজন তা আমাদের নেই। আমরা চাই এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার পুরসভাকে আর্থিক সহায়তা করুক। ঠিক সময়ে জঞ্জাল সাফ করার  জন্য পুর কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ করছে। শুয়োর উচ্ছেদ অভিযান আবারও করা হবে।