সিবিএসইর সিলেবাস কমানো নিয়ে প্রশ্ন

নিউজ ব্যুরো : করোনা পরিস্থিতিতে সারা দেশেই শিক্ষা ব্যবস্থা সংকটের মুখে।  ইতিমধ্যে চার মাসের বেশি সময় কেটে গিয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ। ৩১ জুলাই পর্যন্ত রাজ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকছে। অনলাইন ক্লাসে পড়াশোনা চললেও তাতে যে সম্পূর্ণ সিলেবাস পড়ানো সম্ভব হবে না, তা বিভিন্ন বোর্ডের কর্তারা বুঝেছেন। তাই ৩০ শতাংশ সিলেবাস কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)। বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কোর্স কমিটি, কারিকুলাম কমিটি এবং বোর্ডের পরিচালন কমিটির অনুমোদনক্রমেই এই সিদ্ধান্ত চড়ান্ত করা হয়েছে। সিবিএসই কারিকুলামে আরও বলা হয়েছে, সিলেবাসের যে অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজন পড়লে সেই অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে স্কুলগুলিকে। তবে, এই বাদ দেওয়া অংশ থেকে বোর্ডের পরীক্ষা বা স্কুলের নিজস্ব মূল্যায়নে প্রশ্ন থাকবে না।

সিবিএসইর এই সিলেবাস কমানো নিয়ে বড় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করছেন, যেভাবে সিলেবাস কমানো হয়েছে তাতে আগামীদিনে সমস্যায় পড়বে এখনকার নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়ারা। বিশেষ করে সমস্যা হবে বিজ্ঞানের বিষয়ে। ফিজিক্স ও বায়োলজির ক্ষেত্রে সিলেবাস এভাবে কমানোয় পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষায় এই পড়ুয়ারা পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষাবিদদের অনেকেই বলছেন, বিজ্ঞানের সিলেবাসে দুটি পর্যয় থাকে- মূল ধারণা এবং তার উপর ভিত্তি করে জটিল ভাবনা ও বিশ্লেষণ। সিলেবাস কমানোর সময় সেটা মাথায় রাখা দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে তার বিপরীত পথে হাঁটছে বোর্ড।

- Advertisement -

ফিজিক্সের কথাই ধরা যাক। নিউটনের সূত্র : সরলরেখায় কোনও বস্তুর মোশন, হিট-এর মূল ধারণা তৈরির চ্যাপ্টার বাদ দেওয়া হয়েছে, অথচ তার উপর ভিত্তি করে অনেক অ্যাডভান্সড চ্যাপ্টার রেখে দেওয়া হয়েছে। যেমন, ওয়ার্ক, পাওয়ার ও এনার্জি, তাতে নিউটনের সূত্রের ব্যবহার, কোনও তলের উপর বস্তুর মোশন ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হবে সরলরেখায় বস্তুর মোশন না পড়ে। আবার হিট-এর মতো চ্যাপ্টার না রেখে গ্যাসের কাইনেটিক থিযোরি রেখে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিজ্ঞানের সিলেবাস এভাবে কমানোর দুটো প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। প্রথমত শিক্ষকদের উপর চাপ বাড়বে। দ্বিতীয়ত ছাত্রছাত্রীদের মূল বিষয় না পড়ে সংশ্লিষ্ট বিষয় পড়ার প্রবণতা বাড়বে। শিক্ষাবিদদের প্রস্তাব, বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলি রেখে দেওয়া হোক। প্রয়োজনে তার জটিল প্রযোগ অংশ বাদ দেওয়া যেতে পারে। অথচ সিবিএসইর হ্রাস করা সিলেবাস ঠিক এই ধারণার উলটোদিকে হাঁটছে।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইভোলিউশনারি বায়োলজিস্ট-এর তরফে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সিবিএসই বোর্ডকে এভাবে বায়োলজির সিলেবাস কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয়েছে। দেশের তাবড় বিশেষজ্ঞদের ওই সংস্থার বক্তব্য, বায়োলজি বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় ইকোলজি ও ইভোলিউশনকে যে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি ছিল, তা আমাদের দেশে দেওয়া হয়নি। তার ফল কতটা মর্মান্তিক হতে পারে সেটা এই মহামারি পর্বে বোঝা যাচ্ছে। তাই দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিলেবাসে ইভোলিউশন ও ইকোলজি বিষয়টি প্রায় বাদ দিয়ে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক পদক্ষেপ করার আগে আরও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

উদাহরণ দিয়ে ওই সংগঠনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের থেকে মানুষের মধ্যে যে ধরনের সংক্রমণ ছড়ায় সেই জোনোটিক প্যানডেমিক, তার ফলে কোনও গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি, কোনও রোগজীবাণু সংক্রামক ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়া (প্যাথোজেন)-এর বিস্তারের মতো বিষয়ে ধারণা তৈরির জন্য বাস্তুতন্ত্র ও বিবর্তন (ইকোলজি ও ইভোলিউশন) বিষয়ে ধারণা তৈরি থাকা অত্যন্ত জরুরি। আর এই বিষয়টিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করার জন্য ভারতে কোনও সংক্রামক ব্যাধি এমন মহামারির আকার নেয়। ফলে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিলেবাসে ইভোলিউশন ও ইকোলজি, জীববৈচিত্র‌্য বা ডাইভারসিটি অব লাইফের মতো বিষয় বাদ দেওয়া আগামীতে দেশে বিপর্যয়ে কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এভাবে তড়িঘড়ি সিলেবাস ছেঁটে ফেলার আগে পড়ুয়াদের আরও এক বছর অতিরিক্ত সময় দেওয়ার পক্ষপাতি। সেইসঙ্গে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নিয়ে সিলেবাস কতটা কমানো যায়, তার পর্যালোচনা করা জরুরি বলেও তাঁরা পরামর্শ দিচ্ছেন।