তরাইয়ের একটি চা বাগানে মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে পাতা। ছবি : সূত্রধর

শিলিগুড়ি : হাতের পরিবর্তে চা পাতা তুলছে মেশিন। দ্রুত চা পাতা তোলার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পরিবর্তে প্লাকিং মেশিনের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন চা বাগান মালিকদের একাংশ। এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে শ্রমিকদের ভবিষ্যত্ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ছে চায়ে গুণগত মানও। তবে একাধিক বাগান মালিকের যুক্তি, বর্ষাকালে উত্পাদন নিয়ন্ত্রণ রাখতেই মেশিনের ব্যবহার হচ্ছে। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য মেশিনের ওপর নির্ভরশীলতার কথা আবার বলছেন অনেকে। গুণগত মানের ক্ষেত্রে টি বোর্ডের নজরদারির দাবিও উঠছে।

পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপত্তি তুলেছিলেন অনেকে। মূলত গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু বর্ষা শুরু হতেই বিভিন্ন চা বাগানে শুরু হয়েছে প্লাকিং মেশিনের ব্যবহার। ফলে বর্ষার মরশুমে যে চা উত্পাদন হবে, তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। কেননা পাতা তোলার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নজর থাকে গাছের ওপর। তাঁরা শুধু কচি দুটি পাতাই তোলেন। কিন্তু মেশিনে পাতা তোলার ক্ষেত্রে তা বজায় থাকে না। নতুন পাতার সঙ্গে পুরোনো পাতাও উঠে যায়। অনেক বাগান মালিকের বক্তব্য, পুরোনো পাতা উঠলেও তা বাছাই করে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিক কমের জন্য মেশিন ব্যবহারের যুক্তি যেখানে খাড়া করা হয়, সেখানে পুরোনো পাতা বাছাই করার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাবে কী করে, এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নর্থবেঙ্গল স্মল টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক নিতাই মজুমদারের বক্তব্য, দক্ষ শ্রমিক মেশিন চালালে পুরোনো পাতা কার্যত ওঠে না। দু-একটা পাতা উঠলেও তা ফেলে দেওযা হয়। বর্ষার সময় গাছে প্রচুর পাতা দেখা দেয়। আর তা তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায় না বলে দাবি বাগান মালিকদের। অনেকের বক্তব্য, এই সময় পাতার উত্পাদন বেশি হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বড়ো বাগানগুলি বেশি টাকায় শ্রমিক নিয়ে নেয়। ফলে বর্ষার সময় পাতা তোলার ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট দেখা দেয় ছোটো বাগানগুলিতে। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাগানগুলি মেশিন ব্যবহারে জোর দেয়। এমন যুক্তি দিয়ে নর্থবেঙ্গল টি প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েনের উপদেষ্টা প্রবীর শীল বলেন, বর্ষার সময় উত্পাদন নিয়ন্ত্রণ একটা বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা উত্পাদন এবং শ্রমিক জোগানের অনুপাতের মধ্যে বড়ো পার্থক্য দেখা দেয় এইসময়। তবে গুণগত মানের ওপর নজর দেওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি। টি বোর্ডের গাইডলাইন মেনে মেশিন ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন টি অ্যাসোসিয়েন অফ ইন্ডিয়ার তরাই শাখার সচিব সুমিত ঘোষ। তবে শ্রমিক সংকটের জন্য মালিকপক্ষকেই দায়ী করেছেন ন্যাশনাল ইন্ডিয়ান অফ প্ল্যান্টেশন ওয়ার্কার্স-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি অলোক চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ন্যায্য বেতন না পাওয়ার জন্যই শ্রমিকরা বাইরের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবি জোরালো হচ্ছে। তাছাড়া একজন শ্রমিকের থেকে যন্ত্র চারগুণ বেশি পাতা তুলতে পারে বলে অতিরিক্ত মুনাফার দিকে নজর দিচ্ছেন চা বাগান মালিকরা।