লাহোরের ঐতিহ্যশালী কলেজে রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন

129

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি : দু’দিন আগেই গিয়েছে পঁচিশে বৈশাখ। কোভিড আবহে সেই উৎসাহ, উদ্দীপনায় যদিও এসেছে ভাটা, তবুও বিশ্বকবির আত্মিক আরাধনায় পিছিয়ে নেই রবিভক্তরা। তা সে ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার হোক বা পাকিস্তান। হ্যাঁ পাকিস্তানও। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও তা সত্যি। খুব কম লোক জানেন, পাকিস্তানের একটি প্রাচীন সুবিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও, মহা সমারোহে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। প্রত্যেক বছর ৭ মে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-পড়ুয়ারা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন, গাওয়া হয় গান, পাঠ করা হয় রবীন্দ্র রচনা, আলোচনায় অংশ নেন রবীন্দ্র সাহিত্য, দর্শন ও রাষ্ট্রবাদী চিন্তাধারা নিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।

১৮৬৪ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে (অধুনা লাহোর) প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রাচীন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষাবিদ, মিশনারি ড. চার্লস উইলিয়াম ফর্ম্যান (১৮২১-১৮৯৪)। ১৮৪৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের দশ বছর আগে, কলকাতায় প্রথম পা রাখেন ড. ফর্ম্যান। ১৮৪৯-এ তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাহোরে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পঞ্জাব প্রদেশে গড়ে তোলেন রং মহল স্কুল। এই স্কুলের লাগোয়া অঞ্চলে একটি কলেজ গড়ে তোলেন। প্রথমে নাম ছিল লাহোর মিশন কলেজ। শোনা যায় সম্রাট শাহজাহানের এক ওয়াজিরের বংশধর জায়গাটি ফর্ম্যানকে মিশনের কাজকর্মের জন্য লিজ দেন। এখানেই ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে মিশন কলেজ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই কলেজের পরিচালনা কমিটির শীর্ষ পদে থেকেছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগেই পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার এখানে। ১৮৯৪ সালে লাহোরেই প্রয়াত হন। আজও লাহোরের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ান সিমেট্রিতে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন তিনি। ফর্ম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মিশন কলেজের নতুন নাম রাখা হয় ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দেশভাগের পর হয় লাহোরের পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। ২০০৪ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

- Advertisement -

১৫৭ বছরের ইতিহাসে এই কলেজ বহু নজিরবিহীন কৃতিত্ব গড়েছে। দিয়েছে অসাধারণ কিছু শিক্ষার্থী, পরবর্তীকালে যাঁরা আধুনিক পাকিস্তান ও ভারতে শিক্ষা সংস্কৃতি সমাজ ও রাজনীতির জগতের বহু স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ে রচনা করেন। প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুরেন্দ্রকুমার দত্ত, গণিতজ্ঞ আলমা মাশরিকি, পাকিস্তানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি ও পারভেজ মোশারফ, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল প্রমুখ। আজও পাকিস্তানের আধুনিক শিক্ষার অঙ্গনে গৌরবময় নাম এই কলেজ।

কথিত আছে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষ্যে এই কলেজে একটি শোকসভা আযোজিত হয় তৎকালীন কলেজ অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রকুমার দত্তের উদ্যোগে। ২০ বছর পর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গড়া হয় একটি কমিটি। শুরু হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন। কিন্তু ৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যাবতীয় ভারতীয় তথা রবীন্দ্রচর্চায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন জেনারেল আয়ুব খান সরকার। তাছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় কবি আলমা ইকবালের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা টেনে এনে কবিগুরুর সাহিত্য প্রতিভাকে কখনই সম্মান দিতে চায়নি পাক সরকার। পরে আটের দশকের শেষ ভাগে পরিস্থিতি শান্ত হলে ফের পাকিস্তানে শুরু হয় রবীন্দ্রচর্চা। ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তাতে নিয়েছিল অগ্রণী ভূমিকা। সেই ট্র‌্যাডিশন আজও সমানে চলেছে।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে আছড়ে পড়েছে কোভিড ঢেউ। সেই ঢেউয়ে আঘাতে লন্ডভন্ড ভারত, পাকিস্তানও। তবু দুদেশের সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ আজও রবীন্দ্রচর্চা থেকে সরে আসেননি। সরে আসেনি ১৫৭ বছরের ঐতিহ্যশালী লাহোরের ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজও। ভার্চুয়াল শ্রদ্ধায় রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করেছে তারা। এই সংকটকালে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের তরুণ যুব সম্প্রদায়ে কাছে আজও সমানভাবে গৃহীত রবি ঠাকুরের সেই বাণী চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত…। রবীন্দ্র প্রদর্শিত সেই মুক্তির আলোয় ভেসে, আজও দেশকালের বিরোধ ভুলে রবীন্দ্র আরাধনায় নিমগ্ন ফর্ম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ।