অন্য অঙ্কে অনন্ত-শরণ রবি ঘোষের

389

কৌশিক দত্ত : বেড়ালটা অনেক দিন ধরেই উঁকি দিচ্ছিল। এবার ঝুলি খুলে বেরিয়ে আসছে। তৃণমূলের একসময়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষের হঠাৎ করে মহারাজা-প্রীতির কারণটা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। এটা অনস্বীকার্য যে, রবিবাবুর হাতেই কোচবিহারে তৃণমূলের জন্ম। কিন্তু রাজনীতির পাশা খেলায় এখন তিনি বেশ কোণঠাসা। যে দলকে তিনি তিন দশক ধরে লালন-পালন করেছেন, দলে পরে আসা পার্থ-উদয়ন, এমনকি তাঁর একসময়ে নিত্যসঙ্গী জলিল আহমেদও সেই দলে তাঁকে নিধিরাম সর্দার করে দিতে সচেষ্ট।

রবিবাবুর ভরসা শুধু এতদিনের অনুগত সঙ্গীকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছেঁটে ফেলে দেবেন না। কিন্তু রবিবাবু যে জেলায় দলকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, এটা তৃণমূল নেত্রীর কাছে এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। নেত্রী তাই চাইছেন সম্মানজনক পুনর্বাসন দিতে। পোড়খাওয়া রবিবাবুও অঙ্ক কষে তাঁর পুনর্বাসনের উপায় খুঁজেছেন। রবিবাবু ভালোই জানেন, বংশীবদন বর্মনের হাঁকডাক অনেকটা ফাঁকা কলসির আওয়াজ বেশি প্রবাদের মতো। রাজবংশী ভোটব্যাংকের ১০ শতাংশও এখন তাঁর সঙ্গে আছে কি না সন্দেহ। এতদিনের অভিজ্ঞতায় রবিবাবু বুঝেছিলেন, পার্থপ্রতিমরা নেত্রীকে যাই বোঝান না কেন, বিধানসভা ভোটে কোচবিহারে দলের ভরাডুবি অনিবার্য। এখন রবিবাবু তাঁর কামব্যাক অস্ত্র করতে চাইছেন অনন্ত মহারাজকে।

- Advertisement -

খেলাটা রবিবাবু শুরু করেছিলেন বিধানসভা ভোটের আগেই। অনন্ত মহারাজের সঙ্গে যোগাযোগে তাঁর দূত ছিলেন তৃণমূলের আলিপুরদুয়ারের সহ সভাপতি প্রেমানন্দ দাস। রাজবংশী হওয়ায় প্রেমানন্দবাবুর পক্ষে মহারাজের কাছে ঘেঁষা সহজ ছিল। কুমারগ্রামে প্রেমানন্দবাবুর দাপট থাকলেও আলিপুরদুয়ারের জেলা রাজনীতিতে এখনও পর্যন্ত ব্যাক বেঞ্চে বসা ছাত্র। সামনের সারিতে বসার এমন সুযোগ তিনিও হাতছাড়া করতে চাননি।
ব্যস, অঙ্কের প্রথম ধাপ মিলে গেল। রবিবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মহারাজের শিষ্যদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ শুরু করেন প্রেমানন্দ। শোনা যায়, রবিবাবু  দিদি-কে বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন, বংশীবদনের কাছ থেকে বিশেষ সাহায্য পাওয়া যাবে না। অনন্ত মহারাজের হাতেই কোচবিহারের প্রায় ৪০ শতাংশ রাজবংশী ভোটের নিয়ন্ত্রণ। তাই বিজেপি শিবির থেকে মহারাজকে ছিনিয়ে আনতে পারলে কোচবিহারের হারানো রাজত্ব ফিরে পাওয়া যাবে। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবুজ সংকেত দেন অপারেশন মহারাজ-এ। বিধানসভা ভোটের আগেই মহারাজের সঙ্গে যোগাযোগে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেই কাজে সামনে ছিলেন রবিবাবুর অনুগামী কোচবিহার-২ ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি পরিমল বর্মন। এই অপারেশন সফল হলে কোচবিহারের বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঠিক উলটো হতে পারত। তা হয়নি কোচবিহারের কিছু মেজ-সেজ তৃণমূল নেতার অদূরদর্শিতায়। তাঁদের নাচনকোদনে বিজেপি শিবিরে খবর চলে যায়। পালটা অপারেশন শুরু করে বিজেপি।

শোনা যায়, মহারাজ নাকি কোচবিহারে আসবেন বলে তাঁর সতীবরগাঁওয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে রাস্তায় আটকে ফেরত পাঠান অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকের বাহিনী। তারপর থেকে অনন্ত মহারাজকে চোখের মণির মতো আগলে রেখেছিলেন বিজেপি নেতারা। তার ফলে ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে কোচবিহারে তৃণমূলকে ৭-২ ব্যবধানে পর্যদুস্ত করে বিজেপি।

ভোটের পরেও কিন্তু মহারাজের বাড়িতে মাঝে-মধ্যেই যাচ্ছেন রবিবাবু। সম্প্রতি চতুর্থবার দেখা করেছেন। কেনও তিনি অনন্ত শরণম? রবীন্দ্রনাথ ঘোষের সামনে হঠাৎ একটা সুযোগ এসেছে দিনহাটায় নিশীথ প্রামাণিকের কাছে উদয়ন গুহ হেরে যাওয়ায়। দিল্লির মধুর স্বাদ পাওয়ায় নিশীথ সাংসদ পদ ছাড়তে রাজি হননি। ফলে দিনহাটায় উপনির্বাচন অবশ্যম্ভাবী। বিজেপি দিনহাটায় জিতেছিল নিশীথের কাঁধে ভর দিয়ে তাঁকে ছাড়া দিনহাটা জেতা বাকি পদ্ম-কারবারিদের ক্ষমতায় কুলোবে না। অথচ জেলা রাজনীতি থেকে নিশীথ নিজেকে এখন অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছেন। তার উপর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে তৃণমূল কর্মীরা এখন যতটা উজ্জ্বীবিত, বিজেপি কর্মীরা ঠিক ততটাই হতাশ। রবিবাবু বুঝতে পারছেন, এই সুযোগে কোনওভাবে উদয়ন গুহকে সরিয়ে দিনহাটায় প্রার্থী হতে পারলে তাঁর জয় নিশ্চিত। গৌতম দেব বিধানসভা ভোটে হেরে যাওয়ায় রবিবাবু এখন জিতলে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর আবার পাওয়ার স্বপ্নও আর সম্ভবত অধরা থাকবে না।

এই অঙ্কেই অনন্ত মহারাজের বিশেষ দেখভাল করছেন রবিবাবু। তাঁর অজানা নয় যে, দিনহাটায় ভোটারদের ৩০-৩৩ শতাংশ যে রাজবংশী। মহারাজের সখ্য পেলে তিনি দিদিকে বুঝিয়ে দেবেন, যে রাজবংশী ভোট না পেয়ে পার্থর আমলে জেলায় দলের ভরাডুবি হয়েছে, সেই রাজবংশী ভোট তিনি পুনরুদ্ধার করেছেন। তিনি হারলেও ক্ষতি নেই। তখন সেই হারের সব দায়ভার পড়বে উদয়ন-পার্থ-পরেশের উপর। প্রমাণ হয়ে যাবে, তৃণমূলে তাঁর বিরোধীরা ব্যক্তিস্বার্থে দলকে বলি দিয়েছে। আর তিনি জিতলে জোর গলায় বলবেন, সব বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি মানুষের আশীর্বাদে জিতেছেন। এক ঢিলে তখন কত পাখি যে মারা যাবে।