বিশ্বভারতী পরিচালনায় জীবদ্দশাতেই স্বপ্নভঙ্গ রবীন্দ্রনাথের

766

মৃদুল শ্রীমানী: স্বপ্নভঙ্গ তাঁর ঘটে গিয়েছিল যৌবন অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, তাঁর নিজের দেশের লোকেরা এক-একটা গোটা মানুষ নন। রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি, মুগ্ধ বঙ্গজননীর প্রতি এই ধিক্কার তাঁর কবিতাতেই ছিল। আমেরিকার পুঁজি সন্ত্রাসকেও তিনি ভালোভাবে চিনেছিলেন। এ নিয়ে সৌমেন ঠাকুরকে চিঠিতে অনেক কিছু লিখেও ছিলেন। নিজের দেশের চাষি ঘরের ছেলে একটু লেখাপড়া শিখে কী করে দুর্বলতর চাষিকে শোষণ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেটাও দেখেছিলেন। তিনি দেখলেন, দেশের লোক সমবায় বলতে শুধু টিপে টিপে লোন দিতে শিখেছে, এটাই সমবায়ে একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠল। আর ছোট রায়ত স্বপ্ন দ্যাখে সে গোটাকতক আরও ছোট রায়তকে গিলে বড় রায়ত হয়ে উঠবে।

বিশ্বভারতী নিয়ে এখন কত হইচই। রবীন্দ্র ঐতিহ্য লুপ্ত করে দেওয়া হচ্ছে বলে চারপাশে কত কোলাহল। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পাঁচিল নির্মাণ ঘিরে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে হিংসা, তাণ্ডব ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনার শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ভার অযোগ্য হাতে গিয়েছে বলেও নানা কলরব চারদিকে। এই সমস্যার সূত্রপাত কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই। বিশ্বভারতী তিনি কার হাতে দিয়ে যাবেন, ভেবে পেতেন না। বিশ্বভারতীকে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলতেন, বিশ্ব বা রথী। রথীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র-এ যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে, বিশ্বভারতীর ছাত্রদের মধ্য থেকে তেমন মজবুত মানুষ কেউ উঠে আসছিলেন না। এই শূন্যতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন চওড়া কাঁধের মানুষ। তাঁকে পেতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সুভাষের ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। লেনার্ড এলমহার্স্ট শ্রীনিকেতনের গোড়াপত্তন করে দিয়ে গেলেন। কিন্তু কবির অবর্তমানে বিশ্বভারতীর কী হবে ভেবে উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ গান্ধিজির হাত ধরে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন। বাঁশি তোমার দিয়ে যাব কাহার হাতে।

- Advertisement -

রবীন্দ্রনাথ চারপাশে একটা গোটা মানুষ, সত্যিকারের মানুষের অভাব অনুভব করতেন তীব্রভাবে। তাই বিদ্যাসাগর মশায়কে স্মরণের ছলে লিখেছিলেন, তিনি বঙ্গদেশে একক ছিলেন। গভীর হতাশায় বলতেন, এই বাংলায় আমাকে যেভাবে অপমান করা যায়, এমনি আর কাউকে নয়। সমস্ত প্রচেষ্টা বাঙালির ছোটমির কাছে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেখে তাঁর মনে হত, সমস্তই বুঝি এক আশ্চর্য ছলনাময়ীর কাণ্ড! কবির সবসময় লক্ষ্য ছিল সত্যে পৌঁছোনো। বাংলাকে আদর্শভাবে গড়ে তুলবেন বলে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে বিশ্বকে একটি নীড়ে মেলাতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠিক কী চাইতেন, সেটা তাঁর তৈরি করা প্রশ্নপত্র খুঁটিয়ে দেখলে আন্দাজ করা যায়। প্রতি মুহূর্তে বাঙালির অক্ষমতা আর চিন্তার দৈন্য তাঁর চোখে পড়ত। বিশ্বভারতীর নানা কাজে নিজের চারপাশে থাকা মানুষগুলির কর্মোদ্যোগের সীমাবদ্ধতা তাঁর চোখে পড়ত। শুধুমাত্র বিশ্বভারতী নয়, দেশে স্বাধীনতার নাম করে ঠিক কী যে উদ্ভট একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে, তা তাঁকে প্রবীণ বয়সে উদ্বিগ্ন রাখত। বাঙালি ভদ্রলোকের নির্লজ্জ সুবিধাবাদ আর স্বার্থপরতা ভদ্রসমাজের একজন হিসেবে তাঁকে ক্ষুব্ধ করত, হতাশ করত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বভারতী চত্বরে ভদ্রলোক বাঙালি সমাজ কবিকে সংবর্ধনা জানাতে গেলে প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, গড় বাঙালির এই সাজানো- গোছানো কর্মকাণ্ডকে ভদ্র আচরণ বলে না।

রবীন্দ্রনাথ কখনও মনের কথা বলতে দ্বিধা করেননি। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনায়ও তাই। আগুনখেকো পলিটিশিয়ানরা যখন শাসকের দাঁত, নখ, মুখব্যাদান দেখে গর্তে সেঁধিয়েছেন, কারও মুখে কথাটি সরছে না, তখন ব্রিটিশদের দেওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পেরেছিলেন একমাত্র রবীন্দ্রনাথই। হিসেবি লোক হলে ঠিক ভাবতেন, বইয়ের বিক্রি কমে যাবে কি না, বক্তৃতা করে যে দক্ষিণা মেলার কথা, তাতে কোপ পড়বে কি না ইত্যাদি। অর্থাৎ সাধারণ ভদ্রলোকের দল যেসব প্যারামিটার দেখে ডিসিশন মেকিং করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিসেব তেমন ছিল না। বরং তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল উলটোমুখে। ভালো মানুষ নই রে মোরা, ভালো মানুষ নই- এই কথাটা ছিল তাঁর জীবনসত্য। সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লবীদের কিছু কাজের তিনি কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এই কথাটা কিছু লোকে অট্টরবে বলে শান্তি পায়। কিন্তু, তিনি যে সোভিয়েত ব্যবস্থায় অতি সাধারণের মধ্যে অতি দ্রুত হারে সার্থক শিক্ষা বিস্তারের কার্য্যকর উদ্যোগকে প্রাণভরে সমর্থন করেছিলেন, তাঁর ভিতরের সেই কথাটি উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে বলতে এঁদের কার্পণ্য খুব চোখে লাগে। জীবনে হাসির মতো কান্নাও বহুরকম। সব কান্না তো চোখে দেখে মেপে ফেলা যায় না। যে মানুষ সারা জীবন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কথা বললেন, তিনি যখন চারপাশে বিশ্বভারতীর দায়িত্ব পালনের চওড়া কাঁধ খুঁজে পান না, একটা গোটা জীবনের সাধনা যখন নিষ্ফল হতে বসে, তখন হাউহাউ কান্না আসাটা স্বাভাবিক। চোখ দিয়ে জল গড়াল কী গড়াল না, গড়ালে কতটা পরিমাণ গড়াল, সেটা তত বড় ইশ্যু নয়।

রবীন্দ্রনাথ সিরিয়াসলি চেয়েছিলেন তাঁর প্রয়াণ হোক তাঁর সাধনভূমি শান্তিনিকেতনের নিরালায়। যথার্থ বাউল তাই কাঙ্ক্ষা করে। সাবধান করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নামে স্লোগান দিতে দিতে দেহাবশেষ বহন করা যেন না হয়। তিনি অভিমান করে বলেছিলেন, সে আমারে কে চিনেছ? কিন্তু শান্তিনিকেতনের ম্যানেজার কবির শেষ নির্দেশের একপয়সা দাম দেননি। রথীন্দ্রনাথ তো ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট বা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, কোনওটাতেই দক্ষ ছিলেন না। তাই জোড়াসাঁকোর লোহার গেট ভেঙে উন্মত্ত জনতা কবির দেহাবশেষ লুঠ করে নিয়ে যাবে, এটা আগে থেকে ভেবে পর্যাপ্ত সাবধানতা আগাম তিনি নিয়ে রাখবেন, এটা আশাতীত ছিল। অমানুষ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মরদেহ থেকে চুল ও দাড়ি পর্যন্ত উৎপাটন করে নিয়েছিল স্মারক সংগ্রহের নির্লজ্জ উদগ্র বাসনায়। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অযোগ্য পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের দেহাবশেষের অসম্মান হয়েছিল। নিজের বড় ছেলেকে ভালোই জানতেন কবি। তিনি চেয়েছিলেন, গোলাপবাগান সর্বসাধারণের উপভোগের স্বার্থে লাইব্রেরির সম্মুখে হোক। কিন্তু রথী চাননি। এই নিয়ে বাপ-ছেলেতে বিরোধ হয়েছিল। প্রচণ্ড গরমে ছাদে একটা টিনের ঘরে নিজেকে অভিমানে সরিয়ে নিয়েছিলেন কবি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাগতে জানতেন, কাঁদতে জানতেন, প্রাণভরে ধিক্কার দিতেও জানতেন। তিনি সেই মাপের কবি ছিলেন না, যাঁকে প্রতি মুহূর্তে ব্যালান্স করে ঠেকনা দিয়ে সবদিক বাঁচিয়ে কথা বলতে হয়। তিনি নিজের জোরে সম্মান আদায় করেছিলেন। পলিটিকাল দলের তলপি বহে রত্নহার গলায় পরেননি। তাঁর যা ছিল, তা তাঁর নিজের ছিল। উঞ্ছবৃত্তি করে পাওয়া জিনিস নয়। তাই তিনি নোবেল পুরস্কারের টাকা এলে বলতে পারতেন, ওই তোমাদের নর্দমা গড়ার টাকা এসে গিয়েছে। নোবেল পুরস্কারটি যারা সযত্নে রাখতে পারে না, দোষীকে খুঁজে বের করার পলিটিকাল উইলে যাদের ঘাটতি আছে, তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বাজাতে পারে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনুষ্যত্বচর্চার থেকে তারা যোজনপ্রমাণ দূরে থাকে।