অর্থনীতি ডামাডোলে বিপদবার্তা রঘুরাম রাজনের

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি : ভয়াবহ অর্থনীতির বিপদ সামনে। আড়াই দশকের রেকর্ড ভেঙে জিডিপি-র সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক পতনই শেষ নয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন মনে করছেন, আরও ধস নামতে পারে জিডিপির হারে। এর সঙ্গে অসংগঠিত ক্ষেত্রের লোকসান যুক্ত হলে জিডিপির ঋণাত্মক বৃদ্ধি আরও বেশি হওয়ার বিপদ আসন্ন।

একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে দেশের জিডিপি চিত্রকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন রঘুরাম। তাঁর যুক্তি, ভারতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় অর্থনীতি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারছে না। আয় নিয়ে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। অনেকে বিলাসদ্রব্যে খরচ করতে চাইছেন না। আগামী বেশ কিছুদিন এই প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। এর ফলে উৎপাদন শিল্প ও আর্থিক বৃদ্ধি গভীরভাবে প্রভাবিত হবে। করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রের ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন প্রধানের মতে, আর্থিক প্যাকেজ একটা টনিকের মতো। কিন্তু রোগীর অবস্থা যখন সংকটজনক হয় তখন শুধু টনিকে কাজ হয় না।

- Advertisement -

রাজনের এই বিস্ফোরক বিশ্লেষণ নরেন্দ্র মোদি সরকারের অস্বস্তি বাড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের বিড়ম্বনার আরেকটি কারণ এই বিষয়ে লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীর চৌধুরীর মন্তব্য। এতদিন এই ধরনের সমস্যায় সাধারণত কংগ্রেসের পক্ষে মন্তব্য করতেন রাহুল গান্ধি। কখনও কখনও পি চিদম্বরম অর্থনীতির যুক্তি দিয়ে আক্রমণ শানাতেন। সোমবার অধীরের বাক্যবাণও কম শক্তিশালী নয়। টুইটে তিনি এদিন লেখেন, চিনে যখন ৩.৮ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধি হচ্ছে, তখন ভারতে ২৩.৯ শতাংশ কমেছে। মোদিনমিক্স ধরাশায়ী হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এই কংগ্রেস নেতা বলেন, আপনার উচিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ে সঙ্গে কথা বলা এবং ধৈর্য ধরে তাঁর কথা শোনা। এর আগে প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধিও ২০০৮-এর অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন। অধীরের বক্তব্য, এপ্রিল-জুনে অর্থনীতি সবচেয়ে জোরালো ধাক্কা খেয়েছে। করোনা ও লকডাউনের কারণে চাহিদা ও বিনিয়োগ তলানিতে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিতে গতি আনার নাম করে কেন্দ্রীয় সরকার ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রঘুরাম রাজনের বক্তব্য, পরিস্থিতি সামলাতে আরও এক দফা প্যাকেজ জরুরি। অথচ রাজনের অভিযোগ, সরকার অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নতুন করে বরাদ্দ করতে চাইছে না। তারা সম্পদ ধরে রেখে অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু দ্রুত সরকারি সাহায্য না পেলে বহু মানুষ সমস্যায় পড়বেন। এর ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের পুরো সময়টাই লকডাউনের মধ্যে থাকায় জিডিপি বৃদ্ধির হারে এমন ধস নেমেছে বলে কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক কোনও কোনও অর্থনীতিবিদ যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, এখন দেশে আর্থিক কর্মকাণ্ড চালু হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে গতি এসেছে। এর ফলে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে এই হার কিছুটা বাড়তে পারে। যদি নাও বাড়ে, তবুও নীচে নামার কোনও সম্ভাবনা নেই।

রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন শীর্ষকর্তা কিন্তু এই সাফাইয়ে সঙ্গে একমত নন। নিবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন, এখন বিলাসিতার খরচ, যেমন রেস্তোরাঁয় খাওয়ার মতো খাতে মানুষ কম খরচ করবেন। ভাইরাস যতদিন থাকবে, ততদিন এইসব খাতে মানুষ রাশ টেনে রাখবেন। রঘুরাম বোঝাতে চেয়েছেন, আর্থিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও অর্থনীতি চাঙা হওয়ার বাস্তব উপাদানগুলিই এখন ভারতে অনুপস্থিত। বরং অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বিকল্প পথের হদিস দিয়েছেন ভারতের এই প্রাক্তন আমলা। তিনি লিখেছেন, সরকারের উচিত সচতুর ভাবে খরচ করা, যাতে অর্থনীতিতে সদর্থক গতি আসে। সরকার তা না করে সম্পদ জমিয়ে রাখছে। ভাবছে, আগামীদিনে বড় উৎসাহদান প্রকল্প ঘোষণা করবে। কিন্তু এই কৌশল কাজ দেবে না।

তবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, অবেতনভুক মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিকে বাড়তি নজর দেওয়ার কথা অবশেষে ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। বেতনভোগীদের মতো এঁদের আয় নির্দিষ্ট না হলেও নেহাত নগণ্য নয়। বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়ে-কমে এই মধ্যবিত্তদের হাত ধরেই। উৎপাদন শিল্পের হাল ফেরাতে তাই বেতনভোগী নন, এমন মধ্যবিত্তদের দিকে বাড়তি নজর দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত গোটা বিষয়টি পরিকল্পনার স্তরে রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে অবশ্য, সরকার মধ্যবিত্তদের সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় কোনও পদক্ষেপ করা কঠিন। কর আদায় কমেছে। ভারতের আর্থিক সংকট যে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি হতে চলেছে, জিডিপির পতনের হার শূন্যের অনেক নীচে নেমে যাওয়া সেদিকে ইঙ্গিত করছে বলে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন।

তাঁদের মতে, এবারের সংকট অনেক বেশি সার্বিক। একে নির্দিষ্ট কোনও ক্ষেত্রে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। করোনা সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের চাহিদা কমার প্রবণতা থেকে সেটা বোঝা সম্ভব। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী উৎপাদন, নির্মাণ, হোটেল ও পরিবহণ শিল্প গত কয়েকমাসে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মসংস্থানের একটা বড় অংশ এই ক্ষেত্রগুলিতে হয়ে থাকে। ফলে সংকটের প্রভাব সরাসরি কর্মসংস্থানের ওপর পড়ছে।