বেপাত্তা ডাক্তারদের নাম স্বাস্থ্য ভবনে পাঠাল রায়গঞ্জ মেডিকেল

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ের দশা। অনুমতির তোয়াক্কা না করে কলকাতা সহ শহরতলি এলাকায় বাড়িতে চলে যাওয়ায় রায়গঞ্জ মেডিকেলের প্রায় ২০ জন চিকিৎসক ও পাঁচ স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়ে রীতিমতো হইচই শুরু হয়েছে। গত ৩ মে ছুটিতে থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দুদিনের মধ্যে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনও চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এই বিষয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেলের সহকারী অধ্যক্ষ প্রিয়ঙ্কর রায় বলেন, যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জেলার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের দুদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমরা। পাশাপাশি তাঁদের ১৪ দিনের হোম কোয়ারান্টিনে থাকারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যতক্ষণ না তাঁদের লালা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে, ততক্ষণ তাঁদের কোয়ারান্টিনে থাকার নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনও চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তাই তাঁদের একটি তালিকা তৈরি করে বিকেল পাঁচটার মধ্যে স্বাস্থ্য ভবনে পাঠানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে যা ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাস্থ্য ভবন নেবে। স্বাস্থ্য ভবনের ডিরেক্টর অফ হেলথ অজয় চক্রবর্তী বলেন, এখনও এই সংক্রান্ত কাগজ পাইনি। পেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, রায়গঞ্জ মেডিকেলের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা বড় অংশই ভিনজেলার বাসিন্দা। তাঁরা মূলত কলকাতা বা শহরতলি এলাকায় থাকেন। করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা রায়গঞ্জ মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে এই ব্যাপারে চাপে রেখেছিল। ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান, সেই চাপে পড়েই চলতি মাসের ৩ তারিখ বাইরে থাকা চিকিৎসকদের দ্রুত কাজে যোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছিল মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। হোয়াটসঅ্যাপ ও ই-মেইলের মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দুদিনের মধ্যে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ জারি করলেও তাঁরা মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অন্যদিকে, সম্প্রতি রেড জোন থেকে ফিরে আসা পাঁচ চিকিৎসকের কোয়ারান্টিনে থাকার নির্দেশের পাশাপাশি তাঁদের লালারসের নমুনা সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাতে পাঠানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত তার রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট না এলে ওই পাঁচ চিকিৎসককে কাজে যোগ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তাঁদের শো-কজও করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, যে সমস্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নির্দেশ পাওয়ার দুদিনের মধ্যে কাজে যোগ দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট পাঠানোর পাশাপাশি শোকজ করার জন্য এদিন বিকেলে স্বাস্থ্য ভবনের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে, রায়গঞ্জ মেডিকেলের কয়েকজন চিকিৎসক শনিবার গভীর রাতে চারটি ভাড়া গাড়ি করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পাশাপাশি ওই হাসপাতালেই একদল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ক্যাম্পাস ছেড়ে কলকাতা আসা-যাওয়া করছেন বলেও জেলা শাসকের কাছে অভিযোগ করেন বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ি ও কংগ্রেসের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত। একই সঙ্গে কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সহ উত্তর দিনাজপুরের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রবীন্দ্রনাথ প্রধানের কাছে ই-মেইলে অভিযোগ করেন বিজেপির জেলা থেকে রাজ্যস্তরের নেতারা। এরপরেই হইচই শুরু হয়।এদিকে, করোনা মোকাবিলার জন্য উত্তরবঙ্গের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি সুশান্ত রায়ের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য দপ্তরের মুখ্য সচিবের কাছে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলল অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস। এদিন ওই সংগঠনের তরফে সুশান্তবাবুর বিরুদ্ধে পরিচালনায় অদক্ষতা সহ একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও সুশান্তবাবু বলেন, কে কী অভিযোগ করছেন জানা নেই। রাজ্য সরকার যা নির্দেশ দেবে, সেই মোতাবেক কাজ করব।

তবে কলকাতায় যাওয়া মেডিকেলের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনও কাজে যোগ না দেওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটছে। অভিযোগ, সার্জিক্যাল বিভাগের পাঁচজন চিকিৎসক নেই। সঞ্জয় শেঠ ও রাজা বসাক, এই দুজন এখন শল্য বিভাগ চালাচ্ছেন। আরেক শল্য চিকিৎসক সুরেশ সারোগি রায়গঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় নিজের বাড়িতে থাকলেও স্বেচ্ছায় কোয়ারান্টিনে রয়েছেন বলে অভিযোগ। অ্যানাটমি, চক্ষু বিভাগ, মেডিসিন বিভাগের একাধিক চিকিৎসক অনুপস্থিত। ফলে চিকিৎসা পরিষেবা লাটে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ। যখন উত্তর দিনাজপুর জেলায় করোনা মোকাবিলায় জেলা শাসক অরবিন্দকুমার মিনা, পুলিশ সুপার সুমিত কুমার, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রবীন্দ্রনাথ প্রধান সহ রায়গঞ্জ মেডিকেলের কর্তারা দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন, তখন চিকিৎসকদের একাংশের এই আচরণে হতবাক জেলার বাসিন্দাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকরাও।