৮৬ বছরের এই প্রশিক্ষক এখন চা বিক্রেতা

159

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: তাঁর হাতে টাইপ-শর্টহ্যান্ড শিখে এখন অনেকেই উচ্চপদে চাকরি করছেন। কিন্তু সেই প্রশিক্ষক অজিতকুমার দত্ত ওরফে বংশীদা পেট চালাতে চায়ের দোকান সামলান। বয়স ৮৬ হলেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাড়ি লাগোয়া চায়ের দোকান নিয়েই থাকেন তিনি। এক সময় রায়গঞ্জের টাইপ ও শর্টহ্যান্ডের প্রশিক্ষক বলতে বংশীবাবুকে সবাই চিনতেন। উকিলপাড়া, মোহনবাটি, সুদর্শনপুর এলাকায় তাঁর টাইপ শেখানোর স্কুল ছিল। প্রতিবছর কয়েকশো ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে টাইপ ও শর্টহ্যান্ড শিখতেন।

১৯৫০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত রায়গঞ্জের বহু ছাত্রছাত্রী বংশীবাবুর কাছে টাইপ ও শর্টহ্যান্ড শিখে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অনেকেই সরকারি ও বেসরকারি চাকরি পেয়ে দেশ-বিদেশে রয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বংশীবাবুর কথা স্মৃতির পাতা থেকে মুছে গিয়েছে অনেকের। আজ আর নেই তাঁর টাইপ স্কুল। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়েছে টাইপ রাইটারের ব্যবহারও। স্কুল থেকেই ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ছাত্রছাত্রী থেকে চাকুরিপ্রার্থীরা টাইপ রাইটার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। টাইপ ও শর্টহ্যান্ডের প্রশিক্ষক হিসেবে যাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁরা সেই পেশা বদলে ফেলেছেন। ফলে বংশীদার এখন আর তেমন পরিচিতি নেই। এখন আর কেউ তাঁকে টাইপ প্রশিক্ষক হিসেবে চেনেন না। সকলে বরং চা বিক্রেতা হিসেবেই জানেন তাঁকে। যদিও চায়ের দোকানের দেওয়ালে লাগানো টাইপ স্কুলের সাইন বোর্ডটিই তাঁর পূর্ব পেশার একমাত্র স্মৃতি।

- Advertisement -

বংশীবাবু জানান, ১৯৫০ সালের ২ জানুয়ারি রায়গঞ্জে প্রথম টাইপ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সূচনা হয়। সুদর্শনপুরে নিজের বাড়িতে মাত্র দুটি টাইপ রাইটার দিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি চালু করেন। এরপরে উকিলপাড়া ও মোহনবাটিতে টাইপ স্কুল করেন। বংশীবাবুর দাবি, অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুর, মালদা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এমনকি বিহারের বেশ কিছু জায়গা থেকেও চাকরিপ্রার্থীরা টাইপ ও শর্টহ্যান্ড শিখতে আসতেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত রমরমিয়ে চলেছে বংশীবাবুর টাইপ কলেজ। এরপর রায়গঞ্জ জেলা আদালতে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। কিন্তু মতবিরোধের জেরে আট মাস পর চাকরি ছেড়ে দেন। তবুও বংশীবাবু থেমে যাননি। প্রশাসনের এক কর্তার অনুরোধে বালুরঘাট মহকুমার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি টাইপ কলেজ গড়ে তোলেন। বেশ কয়েক বছর পর আবার ফিরে আসেন রায়গঞ্জে। এলাকায় চাকরিপ্রার্থীদের অনুরোধে নিজের বাড়িতে এবং আশপাশে এলাকায় বাড়িতে গিয়ে টাইপ ও শর্টহ্যান্ডের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে টাইপ কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে কমতে শূন্যে দাঁড়ায়। বিকল্প পেশা হিসেবে চায়ের দোকানই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র ভরসা।