বন্যায় প্লাবিত রায়গঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা, একমাত্র ভরসা নৌকো

372

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: এ যেন কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। বন্যায় প্লাবিত রায়গঞ্জ ব্লকের গৌরী গ্রাম পঞ্চায়েত ও বাহিন গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা। মানুষ ঘরছাড়া। নতুন করে জল ঢুকতে শুরু করেছে আরও কয়েকটি গ্রামে। বাঁধ ফেটে যাওয়ার আতঙ্কে ইটাহার ব্লকের বাড়িওল ঘাট এলাকায় রাত পাহারায় বসেছে গ্রামের বাসিন্দারা। গৌরী ও বাহিন গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় কুড়িটি গ্রাম জলের তলায়। নদীর চেহারা নিয়েছে রাস্তা। ফলে এখন একমাত্র ভরসা নৌকো। কিন্তু সেই নৌকো মিলবে কোথায়? নৌকোর চাহিদা এখন তুঙ্গে। আর তাতেই লক্ষী লাভ রায়গঞ্জের রাজবিহারি মার্কেটের ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের। স্টিল ও চিনা সামগ্রীর জেরে কাঠের আসবাবের বিক্রি কমেছে ফলে আগের মতো ব্যবসা নেই। কিন্তু রায়গঞ্জ ও বিহারের চলতি বন্যা তাঁদের কাছে পৌষ মাস হয়ে দেখা দিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে রাত জেগে চলছে নৌকো তৈরির কাজ। দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু তারপরেও চাহিদা অনুযায়ী যোগান দিতে পারছেন না দোকানদাররা। এক একটি নৌকা বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। দুটো পয়সা আয় হলেও দোকানদাররা অবশ্য বলছেন, এমনটা তাঁরা চান না। দুর্যোগের জেরে মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। ঘটি বাটি বিক্রি করে কিংবা চাঁদা তুলে গ্রামের সবাই মিলে নৌকোর জন্য টাকা জোগাড় করেছেন। ফলে আয় হলেও দুর্গত মানুষের জন্য তাদের মনে কষ্ট রয়েছে।

- Advertisement -

কিছুদিন আগেও যেখানে কাজের বরাত না থাকায় খোশগল্পে মেতেছে আর বিড়িতে সুখ টান দিয়ে হাই তুলে দিন কেটেছে কারিগরদের, গত চার-পাঁচ দিনে পুরোপুরি বদলে গিয়েছে ছবিটা। ওভার টাইম কাজ করে মিলছে দ্বিগুণ মজুরি‌। অনেকেতো আবার কোন মিস্ত্রি নৌকো বানাতে পারেন খোঁজ করে তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছেন।

রায়গঞ্জ রাজবিহারি মার্কেটে পা রাখলে এখন দেখা যাবে আর সব কাজ ফেলে কাঠের ফার্নিচার বিক্রির প্রতিটি দোকানের সামনেই নৌকো তৈরি চলছে পুরোদমে। ব্যবসায়ী বিপ্লব কুণ্ডু বলেন, ‘মূলত আম ও লাল পাকুর কাঠ দিয়ে নৌকো তৈরি হচ্ছে। গত চার দিনে শুধুমাত্র তাঁর দোকান থেকে ২০টি নৌকো বিক্রি হয়েছে। দশ হাতের একটি নৌকো বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। কিংবা আরও বেশি।’

বন্যায় প্লাবিত রায়গঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা, একমাত্র ভরসা নৌকো| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal India

দামের এই ফারাক কেন? পাশের দোকানের ব্যবসায়ী শিবু সাহা বলেন, ‘প্রথমত কাঠের যোগান। তারপর হাতের কাছে মিস্ত্রি পাওয়া। কারও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নৌকো বানিয়ে দিতে হবে বলে অর্ডার ছিল। স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে গিয়েছে।’ কারিগররা জানিয়েছেন, সাধারণভাবে একটি নৌকা তৈরি করতে দুই দিন সময় লাগে কিন্তু এত সময় ছিল না। সকালে অর্ডার দিয়ে বিকেলে কিংবা রাতেই নৌকা নিয়ে গিয়েছেন অনেকে। ফলে যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। ফেরাতেও হয়েছে অনেককে। সব দোকানেই নৌকো তৈরি ব্যস্ততা ছিল। এক একটি নৌকো বানিয়ে কারিগররা দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পেয়েছেন। আবার যে কারিগর ওভারটাইম করেছেন তিনি পেয়েছেন তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

তবে যাঁরা নৌকো কিনছেন তাঁদের বক্তব্য, যে নৌকোর দাম ৮ হাজার টাকা সেই নৌকোই কিনতে হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে। বড় নৌকোর দাম ১০ হাজার টাকা। তবে বন্যার জন্য সেই নৌকো কিনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকা দিয়ে। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে নৌকো। তবুও কিছু করার নেই।

বিহারের বারসই, আবাদপুর, দাসপাড়া, করণদিঘি ব্লকের দোমোহনা, রানিপুর, ইটাহার ব্লকের মহানন্দা নদীর জলে প্লাবিত হয়েছে ডামডোলিয়া ও বাজিতপুর। ওই সমস্ত এলাকার বাসিন্দারাও নৌকো কিনতে ভিড় জমিয়েছেন রায়গঞ্জ শহরের রাজবিহারী মার্কেটে। এদিকে রায়গঞ্জ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা নাগর ও কুলিক নদীর জলে প্লাবিত হয়ে গিয়েছে। আজ এলাকা পরিদর্শনে যান রায়গঞ্জের বিডিও রাজু লামা। তিনি বলেন, ‘সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব বিডিও অফিসের তরফে ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হবে।’